দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের অবসান ঘটিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা, অহংকার ও জবাবদিহির প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
বৃহস্পতিবার দলের নেতাকর্মীদের গণসংবর্ধনায় তারেক রহমানের উচ্চারিত একটি বাক্য দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে, আল্লাহ মানুষকে ক্ষমতা দেন, আবার আল্লাহই সেই ক্ষমতা কেড়ে নেন।
এই বক্তব্যের পরপরই জনমনে ফিরে এসেছে গত ১৫ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস, ক্ষমতার দাপট, বিরোধী দমনের অভিযোগ, গুম, খুন, নিপীড়ন, মিথ্যা মামলা ও দুর্নীতির দীর্ঘ তালিকা।
অনেকের মতে, ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে পড়া একটি সরকার স্বৈরাচারী কায়দায় দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার যে নকশা করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই নকশাই ভেঙে দিয়েছে সময় ও ভাগ্যের নির্মম বাস্তবতা।
তারেক রহমানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সচেতন নাগরিকরা।
শরিফুজ্জামান নামে এক নাগরিক বলেন, ক্ষমতা পেয়ে যারা মানুষের ওপর জুলুম করেছে, ভালো মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে, পরিবার ধ্বংস করেছে, আল্লাহ তার বিচার নিজ হাতে করেছেন। আল্লাহ যদি বিচার করেন, তখন পৃথিবীর কোনো আদালতের রায়ের অপেক্ষা থাকে না।
তার মতে, বিগত সরকারের পতন কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার ও অহংকারের বিরুদ্ধে এক ধরনের ঐশী সতর্কবার্তা।
বিগত দেড় দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দল দমন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল নিয়মিত।
সেলিম নামের একজন বলেন, ক্ষমতার নেশায় মানুষের মাথা কাজ করে না। গরিবের টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে, মানুষকে গুম করা হয়েছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে সারাজীবন জেলে রাখার সংস্কৃতি চালু করা হয়েছে। এই অভিযোগগুলো শুধু রাজনৈতিক মঞ্চে নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তায়ও স্থান করে নিয়েছে। অনেক পরিবার আজও নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় আছে, অনেকেই মামলা ও হয়রানির ভয়ে দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেননি।
রফিকুজ্জামান নামের একজন মানুষ বলেন, মানুষ এত নির্যাতন সহ্য করেছে যে রাতে ঘুমাতে পারেনি। সেই মানুষের অভিশাপেই বিগত সরকার ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিনের শোষণ ও দুর্নীতির পরিণতি অবশ্যম্ভাবী ছিল।
তবে একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতের সরকারকে সতর্ক করে বলেন, প্রতিশোধের রাজনীতি যেন আবার ফিরে না আসে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে।
লুৎফর রহমান মনে করেন, এই নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের লড়াই নয়, এটি হবে বিগত শাসনের ওপর এক ধরনের গণভোট। যারা ক্ষমতায় এসে যেভাবে দেশ চালিয়েছে, জনগণ এবার তার হিসাব নেবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও বলছেন, এই নির্বাচন হবে আস্থার নির্বাচন, জনগণ দেখতে চাইবে কে প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে।
সাধারণ মানুষের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, দেশ আর প্রতিহিংসার রাজনীতি চায় না।
রফিকুজ্জামান বলেন, যদি কেউ অন্যায় করে তবে দেশের প্রচলিত আইনে বিচার হোক। কিন্তু ভালো মানুষকে যেন মিথ্যা মামলা দিয়ে ধ্বংস করা না হয়। এই দাবি শুধু একজনের নয়, এটি হাজারো নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর।
তারা চান আইনের শাসন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অবসান, গুমের সংস্কৃতির চিরতরে সমাপ্তি, দুর্নীতি ও টাকা পাচার রোধ এবং মতপ্রকাশ ও চলাচলের সমান অধিকার।
রবিউল ইসলাম আরও কঠোর ভাষায় বলেন, যদি আগামীতে আবার কেউ বিগত ১৫ বছরের মতো শাসন চালাতে চায়, আল্লাহ তাআলা তাকে ধ্বংস করবেন এবং ক্ষমতা চিরতরে কেড়ে নেবেন। তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে এক ধরনের ধর্মীয় ও নৈতিক বিশ্বাস যে, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী কিন্তু জুলুমের পরিণতি অনিবার্য।
তারেক রহমানের বক্তব্যকে অনেকেই দেখছেন ভবিষ্যৎ রাজনীতির ইঙ্গিত হিসেবে। তার কথায় ছিল না প্রতিশোধের আহ্বান, ছিল আত্মসমালোচনা ও সতর্কতা যেন ক্ষমতা মানুষকে অন্ধ না করে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
সবশেষে জনমতের সারকথা একটাই, মানুষ চায় একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ। যেখানে ক্ষমতা হবে জনগণের সেবা করার মাধ্যম, শোষণের অস্ত্র নয়। যেখানে বিচার হবে ন্যায়ের ভিত্তিতে, প্রতিহিংসার নয়।
একজন বক্তার ভাষায়, এই বাংলাদেশ হোক সবুজ বাংলাদেশ, শান্তির, নিরাপত্তার ও ন্যায়ের বাংলাদেশ। আগামী নির্বাচন সেই স্বপ্ন পূরণের দ্বার খুলবে নাকি আবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, সে সিদ্ধান্ত এবার জনগণের হাতেই।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন