আমাদের সমাজব্যবস্থায় যৌথ সামাজিক পরিচয়বোধ- অর্থাৎ যূথবদ্ধতা, সহাবস্থান ও সমমর্যাদার চেতনায় একসঙ্গে চলার মানসিকতা আজ অত্যন্ত বিরল। আমরা ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা ক্ষুদ্র স্বার্থের খোপে এমনভাবে আবদ্ধ যে, সবার জন্য সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে গড়া একটি বিস্তৃত সামাজিক প্রাঙ্গণের কথা খুব কমই ভাবি। ভাবলেও তা কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটে না।
বাস্তবে আমরা যুক্তিতে নয় বরং তর্কে বা হুজ্জতে উচ্চকিত হই; প্রজ্ঞার চেয়ে চতুরতায় বেশি আগ্রহী হয়ে উঠি। মতভেদকে আমরা সুস্থ মতবিনিময়ের সুযোগ হিসেবে দেখি না, বরং শত্রুতার কারণ হিসেবে দেখি। ফলে নতুন ও মঙ্গলময় কোনো চিন্তা আমাদের উদ্দীপিত করে না, বরং তা সন্দেহ, বিদ্রূপ কিংবা কঠোর প্রতিরোধের জন্ম দেয়।
সংস্কারের বাধা ও বাস্তব চিত্র কেউ যদি শিক্ষা, প্রশাসন বা সামাজিক আচরণে সামান্য পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়, আমরা তা বিচার না করেই ‘অসম্ভব’, ‘অপ্রয়োজনীয়’ কিংবা ‘বিদেশি ভাবনা’ বলে খারিজ করি। আবার কেউ যখন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা বা সমানাধিকারের কথা বলেন, সেটিকে আদর্শবাদী বিলাসিতা বলে তুচ্ছ করা হয়। ফলে পারস্পরিক সৌহার্দ ও সম্প্রীতি আমাদের সমাজে বাস্তব অনুশীলনের বদলে একপ্রকার আকাশকুসুম কল্পনায় পরিণত হয়েছে।
ভালো চিন্তার উদ্ভাবন কিংবা পুরোনো ও অচল চিন্তার প্রতিস্থাপন এখানে প্রায়শই মানসিক আঘাত বা ‘শক’ তৈরি করে। কারণ আমরা পরিবর্তনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত নই। আমাদের সমাজে সুস্থতার দিকে পথ দেখানোর মানুষ খুব কম। যারা আছেন, তাঁরাও প্রায়ই একা, নিঃসঙ্গ ও উপেক্ষিত থেকে যান।
প্রশ্ন ও ভবিষ্যৎ ফলে দিনশেষে কিছু মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়- এই ভাঙা সমাজ-মননে পরিবর্তনের সুর দেবে কে? কে সাহস করে বলবে যে আমরা ভিন্ন মতাদর্শের হলেও একসঙ্গে চলতে পারি? কে দেখাবে যে যুক্তি আর সহমর্মিতা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং একটি সভ্য সমাজের শক্ত ভিত?
যতদিন আমরা এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি না হব এবং নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না করব, ততদিন ‘যৌথ সামাজিক পরিচয়বোধ’ কেবল লেখনীর বিষয় হয়েই থেকে যাবে, জীবনের বাস্তবতায় তার দেখা মিলবে না।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন