নীরব ঘাতকের থাবায় তারুণ্য, বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের নতুন উদ্বেগ

হাসেম রেজা প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০১:১২ পিএম
নীরব ঘাতকের থাবায় তারুণ্য, বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের নতুন উদ্বেগ

ভোরবেলায় যখন সমবয়সী আর দশটা তরুণ মুঠোফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত থাকে, তখন রাজধানীর উত্তর-পূর্ব এলাকার ২৪ বছর বয়সী এক যুবকের দিন শুরু হয় টেবিলের ওপর রাখা সাদা বোতলের ট্যাবলেট দিয়ে। কয়েক মাস আগেও বন্ধুদের আড্ডায় মধ্যমণি থাকা এই প্রাণচঞ্চল তরুণের জীবন থমকে গেছে একটি মাত্র ভুল সিদ্ধান্তে। 

বন্ধুদের সঙ্গে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক নেওয়ার সময় ব্যবহৃত সুচ শেয়ার করাই তাঁর জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি এখন এইচআইভি পজিটিভ। এটি কেবল একজন তরুণের গল্প নয়, বরং এটি বর্তমান বাংলাদেশের তরুণ সমাজের এক ভয়ংকর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশে এইচআইভি সংক্রমণের হার আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে এবং আক্রান্তদের একটি বড় অংশই হলো অবিবাহিত তরুণ-তরুণী।

পরিসংখ্যানের ভয়ংকর বার্তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস ও যৌনবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অর্থাৎ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশে নতুন করে ১ হাজার ৮৯১ জন এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন। একই সময়ে এই মরণব্যাধিতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৬৩ জন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সংক্রমণের জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন। 

২০২৪ সালে নতুন শনাক্তদের মধ্যে অবিবাহিত তরুণ-তরুণীর হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই হার বেড়েছে ১০ শতাংশের বেশি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, এইচআইভি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সাধারণ তরুণ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করছে।

সংক্রমণের হটস্পট ও নতুন গতিপ্রকৃতি কেবল রাজধানী ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরের চিত্রও সমানভাবে আশঙ্কাজনক। উদাহরণস্বরূপ, যশোরে ২০২৫ সালে ৫০ জনের বেশি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে স্কুল ও কলেজগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। 

যশোরের সিভিল সার্জন মো. মাসুদ রানার মতে, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সচেতনতার চেয়ে কৌতূহল বেশি কাজ করে, যা তাদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এদের মধ্যে সমকামী সম্পর্কের মাধ্যমে আক্রান্ত হওয়ার হারও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসকদের মতে, তরুণদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ দায়ী। প্রথমত, মাদক ও অভিন্ন সুচের ব্যবহার। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী তরুণদের মধ্যে একই সুচ ও সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। একজনের রক্তে ভাইরাস থাকলে তা দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, সুরক্ষাবিহীন যৌন আচরণ। কনডম ব্যবহারে অনীহা এবং একাধিক যৌন সঙ্গী থাকা সংক্রমণের অন্যতম বড় কারণ। 

বিশেষ করে সমলিঙ্গীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সঠিক সুরক্ষা না নেওয়া ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তৃতীয়ত, প্রযুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তন। প্রযুক্তির অবাধ বিস্তারের ফলে তরুণদের মধ্যে অপরিচিতদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু জীবনকে উপভোগ করার রোমাঞ্চকর নেশায় তারা নিরাপত্তার বিষয়টি ভুলে যাচ্ছে।

ইউএনএইডস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সায়মা খানের মতে, ২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে এক ধরনের বেপরোয়া জীবনযাপনের প্রবণতা দেখা যায়। তারা ঝুঁকির বিষয়ে পর্যাপ্ত না জেনেই অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছে। এই না জানা বা অজ্ঞতাই সংক্রমণের মূল কারণ।

সামাজিক ট্যাবুর বাধা বাংলাদেশে যৌন স্বাস্থ্য এবং এইচআইভি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা আজও সামাজিকভাবে বাধাগ্রস্ত। পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব বিষয়ে শিক্ষার অভাব রয়েছে। এনজিও কর্মীদের মতে, নিরাপদ যৌনতা শব্দগুলো শুনলেই মানুষ আজও আড়ষ্ট হয়ে যায়। 

এই সামাজিক লজ্জার কারণে আক্রান্ত তরুণরা সময়মতো পরীক্ষা করাতে বা চিকিৎসা নিতে ভয় পায়। ফলে ভাইরাসটি নীরবে অন্যের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। মনস্তত্ত্ববিদ অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, দ্রুত নগরায়ন এবং সামাজিক বন্ধন শিথিল হওয়ার ফলে মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে অবাধ সংযোগ তৈরি হলেও সেই তুলনায় সচেতনতা বাড়ছে না।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশার আলো ও বাস্তবতা ভাইরাসবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জানান, এইচআইভি মানেই মৃত্যু নয়। এটি নিরাময়যোগ্য না হলেও নিয়মিত অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি গ্রহণ করলে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণ মানুষের মতো জীবন কাটাতে পারেন। নিয়মিত ওষুধ নিলে শরীর থেকে অন্যের শরীরে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকিও কমে যায়। 

তবে মূল সমস্যা হলো শনাক্তকরণে বিলম্ব। সামাজিক কলঙ্ক বা লজ্জার ভয়ে অনেকে উপসর্গ দেখা দিলেও পরীক্ষা করান না। যখন তারা হাসপাতালে আসেন, ততক্ষণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটাই ভেঙে পড়ে।

কী করণীয় তরুণদের এই বিপথগামিতা ও মরণব্যাধি থেকে বাঁচাতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে প্রজনন স্বাস্থ্য ও এইচআইভি বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ রোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও নিরাময় কেন্দ্রের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক গোপনীয়তা রক্ষা করে এইচআইভি পরীক্ষার কেন্দ্র বাড়িয়ে আক্রান্তদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করা জরুরি।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি বড় অংশ আজ এইচআইভির ঝুঁকিতে। এটি কেবল স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং একটি বড় সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। তরুণদের কৌতূহলকে সচেতনতায় রূপান্তর করতে না পারলে আগামী কয়েক বছরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। 

সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে তাদের সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, লজ্জা নয়, সচেতনতাই পারে এই নীরব ঘাতক থেকে আমাদের তারুণ্যকে রক্ষা করতে।

জেএইচআর