সমবেত মানবতা ও বিচ্ছিন্ন স্বার্থপরতা: বাংলাদেশের এক সামাজিক প্যারাডক্স

জিয়া উদ্দিন প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৭, ২০২৬, ১০:৪৪ এএম
সমবেত মানবতা ও বিচ্ছিন্ন স্বার্থপরতা: বাংলাদেশের এক সামাজিক প্যারাডক্স

বাংলাদেশের সমাজ এক গভীর ও জটিল বৈপরীত্যে দাঁড়িয়ে আছে। এ দেশের মানুষ ধর্মপরায়ণ, অতিথিপরায়ণ এবং দুর্যোগে-দুর্ভোগে অসাধারণভাবে মানবিক। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা জাতীয় কোনো সংকটে মানুষ হাত ধরে হাত, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়। তখন এই জাতিকে মনে হয় সংহত, সহমর্মী ও অদম্য। এই মানবিক চেতনার সঙ্গেই ইসলামের শিক্ষা সামঞ্জস্যপূর্ণ—কারণ ইসলাম মানুষকে ন্যায়, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের পথে আহ্বান করে।

কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে, যার যার অবস্থান থেকে (সবাই নয়, তবে অনেকেই), সেই মানুষই আবার হয়ে ওঠে আত্মস্বার্থপর, দুর্নীতিগ্রস্ত, প্রতারক এবং পরের ক্ষতিতে এক ধরনের বিকল আনন্দ খুঁজে নেওয়া মানসিকতার বাহক। এখানেই আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বের প্যারাডক্স—সমষ্টিতে মানবিক, কিন্তু এককে কুটিল। মনে হয়, কার্ল মার্ক্সের কথাটি আমাদের বাস্তবতায় অদ্ভুতভাবে খাটে: “The ruling ideas of a society are the ideas of its ruling interests.” 

অথচ কোরআন স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয়—

“হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর অবিচল থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও— এমনকি যদি তা তোমাদের নিজেদের বা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধেই হয়।” (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)

এই ন্যায়বোধ থেকে সরে আসাই আমাদের দ্বিচারিতার মূল।

নিজের ভাগের প্রাপ্তি “ষোলোকলা পূর্ণ” না হওয়া পর্যন্ত মানুষের নিরন্তর, দুরন্ত ছুটে চলা থামে না। অন্যের অধিকার, ন্যায্যতা কিংবা ভবিষ্যৎ—সবই গৌণ হয়ে পড়ে। সমভিব্যাহারে, পরিচ্ছন্ন ও যৌথভাবে বেড়ে ওঠার যে দর্শন, তা আমাদের সমাজে আজও বিরল। আমরা বুঝতে চাই না যে ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি কখনোই সামষ্টিক কল্যাণের বাইরে টেকসই নয়। প্রবাদে যেমন বলা হয়, “A rising tide lifts all boats.” ইসলামের ভাষায়ও এই সামষ্টিক নৈতিকতার কথাই এসেছে—প্রতারণা ও অন্যায় মাপে দেওয়া সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে,

“ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে ও ওজনে কম দেয়।” (সূরা আল-মুতাফ্ফিফিন: ১–৩)

এই আত্মস্বার্থমগ্নতা ও সীমাহীন দুর্নীতিই আমাদের পশ্চাৎপদতার প্রধান কারণ। অবৈধ অর্থ উপার্জনের মোহ এক রাহুগ্রাসের মতো সমাজকে গ্রাস করছে। কেউ থামছে না, এমনকি ভাবছেও না—কোথাও কি থামার প্রয়োজন আছে? এই অন্ধ ইঁদুরদৌড়ে দিনের শেষে মানুষ আর মানুষ থাকে না; নৈতিকতাহীন এক যান্ত্রিক সত্তায় রূপ নেয়। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করে দিয়েছেন—“যে প্রতারণা করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম)

মুখে এক কথা, কাজে আরেক—এই দ্বিচারিতা আর মানসিক বন্ধ্যাত্ব একসময় আমাদের সবাইকে গ্রাস করবে। আমি বিশ্বাস করি, এই পথের শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করছে এক সামাজিক ব্ল্যাক হোল—যেখানে নৈতিকতা, মানবতা ও সহমর্মিতা আলো হারিয়ে ফেলবে।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই দৌড়ে আমরা ভুলে যাই অর্থনৈতিক পিরামিডের তলানিতে থাকা মানুষদের কথা—“the forgotten man at the bottom of the economic pyramid.” অথচ ইসলাম বিশ্বাসকে এখানেই শর্তযুক্ত করেছে। মহানবী ﷺ বলেছেন,
“তোমাদের কেউই প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই কামনা করবে, যা সে নিজের জন্য কামনা করে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

গান্ধীর কথার সঙ্গেও এটি গভীরভাবে মিলে যায়: “The true measure of a society is how it treats its weakest members.”

মননে ও বয়ানে পরিচ্ছন্ন, নৈতিকভাবে বিকশিত মানুষ আজ এই সমতটে সত্যিই বিরল। আর এই বিরলতাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় বিপদ—কারণ সমাজ বদলায় আইন দিয়ে নয়, বদলায় মানুষের বিবেক জাগ্রত হলে; আর সেই বিবেক জাগরণের মূলেই আছে ন্যায়, আমানতদারি ও আত্মসংযম—যা ইসলামী মূল্যবোধের কেন্দ্রে অবস্থিত।

এএন