বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- ক্ষমতার পালাবদলের পর কি সত্যিই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলেছে, নাকি কেবল পুরনো সংস্কৃতির নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে?
গত দুই বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি, সীমান্ত হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, বিচারহীনতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ধারাবাহিক উপসর্গে পরিণত হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন Human Rights Support Society (HRSS)-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছর রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১৪টি ঘটনায় অন্তত ১৩৩ জন নিহত এবং ৭,৫১১ জন আহত হন। একই প্রতিবেদনে নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্রও উঠে আসে; ৮২৮টি ধর্ষণের ঘটনায় ৪৭৪ জন ছিল শিশু।
একসময় বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছে। দলটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ একাধিক সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে। সেখানে বলা হয়, ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিএনপির হাজারো নেতাকর্মী হত্যা ও গুমের শিকার হয়েছেন।
কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রশ্ন উঠছে- বিএনপি কি সেই পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের হতে পেরেছে?
Transparency International Bangladesh (TIB)-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ৬০০টি ঘটনার মধ্যে ৫৫০টির সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে চাঁদাবাজি, প্রতিহিংসামূলক মামলা, রাজনৈতিক ভয়ভীতি ও বিচারব্যবস্থার অপব্যবহারের অভিযোগও উঠে আসে।
একইভাবে The Daily Star এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ‘দুর্বৃত্তদের’ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। এমন কি দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল, সহিংসতা ও হত্যার অভিযোগ উঠে আসছে বিভিন্ন জেলায়।
দুর্নীতির প্রশ্নেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এখনো অন্ধকার। সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পে দুর্নীতির মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষতি হয়েছে।
একইভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং কয়েকজন সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল আদায়ে অনিয়মের অভিযোগে মামলা করেছে দুদক। সেখানে সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক, ওবায়দুল কাদের এবং এম এ মান্নানের নামও উঠে আসে।
অন্যদিকে, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বিভাজনের আড়ালে দুর্নীতির ‘অলিখিত ঐক্য’ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সিলেটের সাদা পাথর এলাকায় অবৈধ পাথর উত্তোলনে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও প্রশাসনের একাংশের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া যায় দুদকের অনুসন্ধানে।
রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে দায়ী করলেও বাস্তবতা হলো- সাধারণ মানুষ এখন আর কেবল দল বদল দেখতে চায় না। তারা দেখতে চায় ব্যবস্থার পরিবর্তন। কারণ জনগণ বলছে, সরকার বদলায়, কিন্তু চাঁদাবাজি বদলায় না, নেতা বদলায়, কিন্তু দুর্নীতির কাঠামো অটুট থাকে।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকট কেবল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নয়, এটি আস্থার সংকট। মানুষ রাষ্ট্রকে আর নিরপেক্ষ আশ্রয় হিসেবে দেখছে না। বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন, প্রশাসনের রাজনৈতিক ব্যবহার, সীমান্তে মৃত্যুর মিছিল, সাংবাদিকদের ওপর চাপ, এবং জননিরাপত্তার অবনতির কারণে জনগণের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। একটি রাষ্ট্র তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন জনগণ বিশ্বাস হারায় যে আইন সবার জন্য সমান। বাংলাদেশ আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন