শুক্রবার দুপুরের তপ্ত রোদ। চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকার কিউসি ট্রেডিং লিমিটেড ফিলিং স্টেশনের সামনে তাকালে মনে হতে পারে কোনো বড় উৎসবের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু বাস্তবে এটি কোনো উৎসব নয়, বরং এক অদৃশ্য সংকটের আশঙ্কায় কয়েকশ যানবাহনের দীর্ঘ লাইন।
অ্যাম্বুলেন্স, ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে শুরু করে শত শত মোটরসাইকেল, সবাই চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে তেলের নজেলের দিকে। সবার লক্ষ্য একটাই গাড়ির তেলের ট্যাংকটি ফুল করে নেওয়া।
শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে পাওয়া খবরে জানা যায় যে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্স চালক মোহাম্মদ মামুন এক বুক দুশ্চিন্তা নিয়ে জানান চারদিকে খবর রটেছে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের সংকট শুরু হচ্ছে। জীবন বাঁচানোর বাহন যার হাতে সেই মামুনের ভয় তেল না থাকলে জরুরি রোগী নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন।
তাঁর ভাষায় এখনো তেল পাওয়া যাচ্ছে তাই কষ্ট করে হলেও কিনে রাখছি, পরে যদি পাম্প শুকিয়ে যায় তবে তো গাড়ির চাকা আর ঘুরবে না। একই চিত্র দেখা গেল মোটরসাইকেল চালক জলিলের ক্ষেত্রে। অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং করে যার সংসার চলে তাঁর কাছে এক লিটার তেল মানেই কয়েকশ টাকার রুটি রুজি। প্রায় এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি তেলের দেখা পাননি। জলিলের আতঙ্ক আরও গভীর কারণ তিনি শুনছেন জাহাজ আসছে না এবং যুদ্ধ লেগেছে। আমাদের মতো গরিব মানুষের তো ঘরে জমানো টাকা নেই, তেল না থাকলে কাল না খেয়ে থাকতে হবে।
ফিলিং স্টেশনগুলোর কর্মকর্তাদের নাভিশ্বাস ওঠার দশা। কিউসি ট্রেডিংয়ের ব্যবস্থাপক মীর খান জানান তাঁদের স্টেশনে স্বাভাবিক দিনে যেখানে ৮ থেকে ৯ হাজার লিটার অকটেন বিক্রি হয়, সেখানে গত দুদিন ধরে তা ২০ হাজার লিটার ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ চাহিদাকে ছাপিয়ে গেছে আতঙ্কিত মানুষের অতিরিক্ত কেনার প্রবণতা। একই চিত্র দেখা গেছে প্রবর্তক মোড়ের আলহাজ ফয়েজ আহমদ অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনেও। সেখানে ডিজেলের চাহিদাও গত দুদিনে প্রায় ৩ হাজার লিটার বেড়েছে।
ব্যবস্থাপক মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনছে। যাদের ৫ লিটার দরকার তারা ১০ লিটার চাইছে, এই বাড়তি চাহিদা সামলানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। বিশেষ করে বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির কয়েকটি জাহাজের শিডিউল পিছিয়ে যাওয়ায় মানুষের মনে ধারণা জন্মেছে যে দেশ হয়তো জ্বালানিহীন হয়ে পড়বে। আর এই ধারণাই মনস্তাত্ত্বিক চাপের সৃষ্টি করেছে যা বাজারে কৃত্রিম চাহিদার পাহাড় তৈরি করছে।
বাজারে যখন এমন অস্থিরতা তখন সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। আজ শুক্রবার বিকেলে এক বিশেষ বার্তায় জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম স্পষ্ট করে জানিয়েছেন দেশে বর্তমানে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। প্রতিমন্ত্রী বলেন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কিছু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে রাখছেন।
তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, আমাদের মজুত পর্যাপ্ত এবং আগামী সপ্তাহের মধ্যেই জ্বালানি তেলবাহী পাঁচটি জাহাজ দেশে পৌঁছাবে, ফলে সরবরাহে ঘাটতি হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি আরও যোগ করেন সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির সব ব্যবস্থা চূড়ান্ত রাখা হয়েছে, তাই অযথা আতঙ্কিত হয়ে পাম্পগুলোতে ভিড় না করার জন্য তিনি অনুরোধ জানান।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে তেলের অভাবের চেয়ে তথ্যের অভাব ও গুজব বেশি কাজ করছে। যখনই কোনো আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি হয় সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের একটি তাড়না তৈরি হয়। কিন্তু এই প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা আদতে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগই বাড়ায়।
চট্টগ্রামের ষোলশহর বা প্রবর্তকের পাম্পগুলোতে আজ যে চিত্র দেখা গেছে তা কেবল তেলের সংকট নয়, বরং মানুষের মনের আশঙ্কারই প্রতিফলন। সরকারের তরফ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হলেও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ থেকে যুদ্ধের মেঘ না সরা পর্যন্ত এই অস্থিরতা কমার লক্ষণ ক্ষীণ।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন