ইসলামের ০৫টি মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে যাকাত অন্যতম। যাকাতের অর্থ হলোঃ পবিত্র করা, পরিশুদ্ধ করা। প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক, বালেগ, ঋণমুক্ত, মুসলমানের গচ্ছিত নিসাব পরিমাণ সম্পদের ওপর নির্ধারিত অংশ সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করা বা তাদেরকে ঐ সম্পদের মালিক বানিয়ে দেওয়া।
পবিত্র কোরআনুল কারীমে রাব্বুল আলামীন বলেন, “তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার” (সূরা যারিয়াত, আয়াত-১৯)। স্বাধীন, বালেগ, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন, ঋণমুক্ত, মুসলমান নিসাব পরিমাণ বর্ধনশীল সম্পদের মালিক হলে এবং সম্পদ এক বছর নিজের কাছে গচ্ছিত থাকলে তার ওপর যাকাত ফরজ।
নিসাব পরিমাণ সম্পদশালীদের সম্পদে কার অধিকার রয়েছে সেটাও পবিত্র কোরআনুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যাকাত কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত, ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্যে; যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয়-তাদের জন্যে; দাস মুক্তির জন্যে; ঋণগ্রস্থদের জন্যে; আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী ও মুসাফিরদের জন্যে; এটা আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’ (সূরা তাওবা, আয়াত-৬০)। যাকাত পাবেন যারা-
ক) ফকির: যে সকল মুসলমানের মালিকানায় নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো সম্পদ নেই। যে সকল মুসলমান যথাসাধ্য চেষ্টা সত্ত্বেও প্রাত্যহিক ন্যায়সঙ্গত প্রয়োজনটুকু মেটাতে পারেন না, তারা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
খ) মিসকিন: যে সকল মুসলমানের কিছুই নেই। যার কাছে একবেলা খাবারও নেই। প্রাত্যহিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য অন্যের কাছে হাত পাততে হয়। তারা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
গ) আমিলিন: যে সকল লোক শুধুমাত্র যাকাত আদায়, সংরক্ষণ ও বিতরণের কাজে নিয়োজিত। যাকাত সংশ্লিষ্ট কাজ ব্যতীত জীবন-ধারণের জন্য অন্য কোনো আয় নেই। তারা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
ঘ) মুয়াল্লাফাতুল কুলুব: বিধর্মীদের মুসলমান হওয়ার জন্য অন্তর জয় করার লক্ষ্যে। অথবা মুসলিম হওয়ার পর আর্থিক সংকটে পতিত হওয়ার শঙ্কা থাকলে। তারা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
ঙ) ক্রীতদাস: ক্রীতদাসকে স্বাধীন জীবনযাপনের সুযোগ করে দেয়ার জন্যে। নিঃস্ব, অসহায় বন্দীকে মুক্তির জন্যেও এ খাতে দান করা যায়।
চ) ঋণগ্রস্থ: যিনি ঋণগ্রস্থ কিন্তু ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য নেই বা ঋণ পরিশোধের সমপরিমাণ সম্পদ নেই।
ছ) আল্লাহর পথে: যারা ইসলামের মাহাত্ম প্রচারের জন্য ব্যস্ত থাকায় জীবিকা অর্জনের জন্য অবসর পান না। এছাড়া যার দ্বীন শিক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে (শিক্ষার্থী)। তারা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
জ) মুসাফির: নিজের এলাকায় আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হলেও যারা দূরে সফরে গিয়ে কষ্টে নিপতিত হয়েছে তাদের জন্য। তারা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
আবহমান কাল থেকেই বাংলাদেশের বিত্তশালীগণ নিজ নিজ বিবেচনায় ব্যক্তিগতভাবে যাকাত প্রদান করে আসছেন। এই দানকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার জন্য সরকার ১৯৮২ সালে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে যাকাত বোর্ড গঠন করেন। পরবর্তীতে উক্ত অধ্যাদেশ রহিত করে ২০২৩ সালে যাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৩ প্রণীত হয়। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় করে তা যাকাতপ্রার্থীদের মাঝে বণ্টন করা হয়।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, আদায়কৃত যাকাতের কোনো অংশই যাকাত প্রদান ব্যতীত অন্য কোনো কাজে ব্যয় করা হয় না। অর্থাৎ যারা রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় ও বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদের বেতনভাতা, দাপ্তরিক যাবতীয় ব্যয়, যাকাতের প্রচার-প্রচারণা, দায়িত্ব পালনে উৎসাহ দানের জন্য পুরস্কার প্রদানসহ যাবতীয় ব্যয় রাষ্ট্র বহন করে থাকে।
বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায় যে, বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গ শাড়ি-লুঙ্গি কিনে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যাকাত প্রদান করে থাকেন। আবার যাকাতপ্রার্থী বিভিন্ন জায়গা থেকে কাপড় নিয়ে সেটা বিক্রি করে টাকা নিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটান। বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। যাকাত প্রার্থীকে তার অংশের মালিক বানিয়ে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। তিনি তার মালিকানার অংশের টাকা দিয়ে কী করবেন, সেটা একান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তার হয়তো কাপড়ের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন খাবারের। অথচ তাকে দেওয়া হলো কাপড়। বাধ্য হয়েই তিনি কাপড় বিক্রি করবেন। আবার কারও হয়তো চিকিৎসার প্রয়োজন। তাকে দেওয়া হলো খাবার। অন্যদিকে ঢাকঢোল পেটানোর কারণে অনেক যাকাতপ্রার্থী প্রয়োজন থাকলেও লজ্জায় যাকাত গ্রহণের এ আয়োজনেও যেতে পারেন না। অথচ তার অর্থের খুবই প্রয়োজন ছিল। সর্বোপরি বিধান অনুযায়ী যাকাত প্রার্থী পাওনাদার। পাওনাদারের পাওনা পরিশোধের জন্য ঢাকঢোল পিটাতে হবে কেন?
মানুষের যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ হয়ে যায়, তখন সে সম্পদ ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। আর মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য শয়তান তাকে বিপথে পরিচালিত করে। তাই মানুষ যাতে নিয়ন্ত্রণহীন না হয়, অন্যায় অবৈধ পথে ব্যয় না করে, তার সম্পদের একটি অংশ বঞ্চিত, অভাবগ্রস্তদের প্রদানের জন্য রাব্বুল আলামীন বিধান দিয়েছেন।
আমিলিন কিংবা ক্রীতদাস খাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে আদায়কৃত যাকাতের অর্থ ব্যয় করা হয় না বলে নিশ্চিতভাবে জানা গেছে। বর্তমান বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তি ও বাস্তবতা বিবেচনায় দৈব দুর্বিপাক ছাড়া সাধারণত মুসাফির খাতের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হয় না। কারণ সামর্থ্যবান ব্যক্তি তার প্রয়োজনে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে তার প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন। তাই মুসাফির খাতের ব্যবহার খুব একটা দেখা যায় না। মুয়াল্লাফাতুল কুলুব খাতে এখন আর সেভাবে যাকাত দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায় না, তবে এ খাতের অংশ হিসেবে নও-মুসলিম যারা মুসলমান হওয়ার পর আর্থিক সংকটে পতিত হয়েছে, তাদের বিষয়টি বিবেচিত হয়। আল্লাহর পথে খাতের অর্থ সাধারণত শিক্ষার্থীদের, বিশেষত যারা ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করছেন, তার জন্য ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে ফকির, মিসকিনের সংজ্ঞায় কতজন পড়েন তা বিবেচনার দাবি রাখে। যদিও ফকির-মিসকিন নেই এমনটি বলা যায় না, তবে যাকাত দাতারা প্রকৃত ফকির-মিসকিনের নিকট তাদের যাকাতের টাকা পৌঁছে দিতে পারছেন কি না, তা দেখা প্রয়োজন। নদী ভাঙন, বন্যা, প্রাকৃতিক দূর্যোগে মানুষ হঠাৎ সহায়-সম্বলহীন, নিঃস্ব, ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ে। ফলে ঋণগ্রস্থের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা যেতে পারে।
দেখা গেছে, যারা অতি সচেতন, যারা সকল সুযোগ-সুবিধার খবর রাখেন, তারা নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যারা একটু অসচ্ছল, কিংবা অফিসের পিয়ন, সিকিউরিটি গার্ড, ড্রাইভার, কাজের লোকদের যাকাত পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। চাই তাদের যাকাত পাওয়ার যোগ্য হন বা না হন। অথচ এদের অনেকেই মাসিক নিয়মিত বেতনে চাকুরি করেন, দামি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। তবে এদের মধ্যে কঠিন রোগে আক্রান্ত বা অন্য কোনো কারণে আর্থিক সংকটে নিপতিতদের বিষয়টি অবশ্যই আলাদা। আবার দেখা যায়, একই ব্যক্তি একাধিক বার বিভিন্নভাবে যাকাত পেয়ে থাকেন। কিন্তু প্রকৃত হকদারদের অনেকেই এসব জানেন না এবং খোঁজ খবরও রাখেন না। কিংবা যাকাত দাতারা তাদের সাথে কোন যোগাযোগ রাখেন না। তাই তারা হয়তো কখনোই যাকাতের অর্থ পান না। অথচ আলেম উলামাগণ কোরআন শরীফের আয়াত উল্লেখ করে বলে থাকেন, যাকাত গ্রহীতাগণের কাছে তাদের অংশ পৌঁছে দেওয়া যাকাত দাতাদের অবশ্য পালনীয়।
বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থায় বিবেচনা করে, বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের সমন্বয়ে বর্তমান সময়ে কোন কোন খাতে যাকাত প্রদান করা যায় তার সহজবোধ্য, সুষ্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। যাতে ধর্মীয় জ্ঞান না থাকা ব্যক্তি নিজেই নীতিমালা দেখে যাকাত প্রদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এছাড়া নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে-
১। সরকারি হাসপাতালে (যেখানে সাধারণত গরীব রোগীরা চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকেন) নোটিশ লাগিয়ে অসমর্থ রোগীদের যাকাত প্রদান করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
২। ঋণগ্রস্থদের যাকাত প্রদান করা হয় মর্মে প্রচারণা চালানো যেতে পারে।
৩। নদী ভাঙন এলাকায় যাকাতের বিষয়টি প্রচার করা যেতে পারে।
৪। প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় যাকাতের অর্থ বিতরণ করা যেতে পারে।
৫। নিজে প্রকৃত যাকাতপ্রার্থী খুঁজে না পেলে রাষ্ট্রীয় কিংবা সামাজিক কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাকাত প্রদান করা যেতে পারে।
৬। সামাজিক সকলেরই দায়বদ্ধতা থাকা প্রয়োজন, যে নিকটবর্তী যাকাত পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিকে যাকাত দাতা ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে হবে।
৭। যাকাত একটি ধর্মীয় বিষয় হওয়ায় যাকাত প্রার্থীর নিকটবর্তী আলেম-ইমামের সুপারিশ নিয়ে যাকাত প্রদান করা যেতে পারে।
৮। একযোগে একই সময়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যাকাত প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
৯। যাকাত প্রদানে নগদ অর্থ প্রদান করা যেতে পারে, যাতে যাকাত প্রার্থী তার প্রয়োজন মিটাতে পারে।
আশার কথা, জনগণ ধীরে ধীরে যাকাত প্রদানে উৎসাহী হচ্ছে। কেউ কেউ নিজে গিয়ে বা ফোন করে সরকারি যাকাত ফান্ডে যাকাত দিচ্ছেন। ব্যাপক প্রচারণা চালানো গেলে এবং যাকাত বিতরণ ব্যবস্থায় পরিপূর্ণ স্বচ্ছতা আনা গেলে এ খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ সম্ভব হবে। যা বিপুল পরিমাণ যাকাতপ্রার্থীর চাহিদা পূরণ করে রাব্বুল আলামীন-এর বিধান পালনে সহায়ক হবে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন