পরিচয়ের রাজনীতি ডেকে আনে জাতীয় ধ্বংস

রাজীন আহমেদ পঙ্কজ প্রকাশিত: মার্চ ১১, ২০২৬, ১২:৫০ পিএম
পরিচয়ের রাজনীতি ডেকে আনে জাতীয় ধ্বংস

বাংলাদেশের মানুষ ২০২৬ সালের নির্বাচনের দিকে তাকিয়েছিল একটি নতুন গণতান্ত্রিক শুরু হিসেবে। দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসন, দমন-পীড়ন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার পর মানুষ আশা করেছিল এবার হয়তো রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে। কিন্তু নির্বাচনের পর যে বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে, তা নতুন আশার চেয়ে পুরনো রাজনৈতিক রোগকেই বেশি স্পষ্ট করছে।

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters জানায়, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী যারা নতুন করে বৈধতা ফিরে পায়-৬৮টি আসন লাভ করে, যা তাদের জন্য ঐতিহাসিক সাফল্য। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একদিকে বিএনপির একক ক্ষমতা, অন্যদিকে জামায়াতের শক্তিশালী সংসদীয় উত্থান এই দুই বাস্তবতা একসঙ্গে সামনে এসেছে।

কিন্তু এই নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থামেনি। জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি নির্বাচনের পর “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” বা ফলাফল প্রভাবিত করার অভিযোগ তোলে। bdnews24.com-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেই এই অভিযোগ রাজনৈতিক অস্থিরতার বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। জামায়াত ৩২টি আসনে পুনর্গণনার দাবিও জানায় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।  

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যও স্বীকার করতে হবে: Netra News প্রায় এক হাজার কেন্দ্রের স্বাধীনভাবে সংগৃহীত ফলাফল-শিট পর্যালোচনা করে জানায়, নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফলের সঙ্গে মাত্র কয়েকটি ছোটখাটো অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন ২০২৬ সালের নির্বাচনকে “credible” ও “competently managed” বলে উল্লেখ করেছে, যদিও তারা ভবিষ্যৎ সংস্কারের সুপারিশও দিয়েছে। তাই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে গুরুতর হলেও, তা আদালত বা স্বাধীন তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সাংবাদিকতার ভাষায় “অভিযোগ” হিসেবেই রাখতে হবে।

কিন্তু নির্বাচন শুধু ব্যালটের হিসাব নয়; নির্বাচন হলো ক্ষমতার চরিত্রের পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় বিএনপি ও জামায়াত দুই পক্ষই জনগণের সামনে কঠিন প্রশ্নের মুখে।

জামায়াতে ইসলামী আজ সংসদে শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে দাঁড়ালেও দলটির রাজনৈতিক অতীত এবং মতাদর্শগত অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ পুরনো। ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ইতিহাস, এবং সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখনো দলটির চারপাশে ঘুরছে। সাম্প্রতিক সময়ে আরও উদ্বেগ তৈরি করেছে বাংলাদেশি ইসলামপন্থী নেতাদের আফগান তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ।

The Daily Star, Prothom Alo এবং The Business Standard—তিনটি সংবাদমাধ্যমই ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রিপোর্ট করে যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা মামুনুল হকের নেতৃত্বে সাত সদস্যের ইসলামপন্থী আলেম প্রতিনিধি দল তালেবান সরকারের আমন্ত্রণে আফগানিস্তানের কাবুল সফর করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা আফগান প্রধান বিচারপতি, কয়েকজন মন্ত্রী, জ্যেষ্ঠ আলেম এবং তালেবান কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা ছিল।

এখানে জামায়াতের সরাসরি প্রতিনিধি ছিলেন- এমন প্রমাণ উল্লিখিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায় না। কিন্তু রাজনৈতিক প্রশ্নটি এখানেই: যখন বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির একটি অংশ তালেবান শাসনকে “মডেল” হিসেবে দেখার আগ্রহ দেখায়, তখন জামায়াত কি স্পষ্টভাবে সেই উগ্র রাজনীতি থেকে নিজেকে আলাদা করতে পেরেছে? নাকি তারা নীরব সুবিধাভোগীর ভূমিকায় আছে?

তালেবান কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল নয়। নারীশিক্ষা, মতপ্রকাশ, সংখ্যালঘু অধিকার এবং গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার প্রশ্নে তাদের অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত। এমন একটি শাসনের সঙ্গে বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির ঘনিষ্ঠতা শুধু কূটনৈতিক ঘটনা নয় এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচরিত্রের জন্য সতর্কসংকেত।

অন্যদিকে বিএনপিও আজ নৈতিক উচ্চভূমিতে দাঁড়িয়ে নেই। দলটি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদ, দমননীতি ও ভারতঘনিষ্ঠ রাজনীতির সমালোচনা করেছে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: তারা কি সত্যিই স্বাধীন, স্বচ্ছ ও জনগণকেন্দ্রিক রাজনীতি করবে, নাকি পুরনো ক্ষমতার খেলাই নতুন নামে চালাবে?

Reuters জানায়, তারেক রহমানের সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। Guardian-ও উল্লেখ করেছে, নতুন সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দুর্নীতি মোকাবিলা এবং আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে।  

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা অপরাধ নয়; রাষ্ট্রীয় কূটনীতি প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন জনগণের সামনে এক ভাষা, ক্ষমতার করিডরে আরেক ভাষা চলে। বিএনপি যদি জনগণের কাছে “ভারতবিরোধী জাতীয়তাবাদ” বিক্রি করে, আবার ক্ষমতায় এসে দিল্লির সমর্থনকে রাজনৈতিক নিরাপত্তা হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে সেটি নীতির রাজনীতি নয় সেটি সুবিধাবাদের রাজনীতি।

Awami League-এর সঙ্গে বিএনপির “হাত মেলানো” বা ভারতীয় সহায়তায় ক্ষমতায় আসার অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিতর্ক আছে, তবে সরাসরি প্রমাণিত তথ্য সীমিত। এই অভিযোগকে তাই প্রমাণিত সত্য হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক সন্দেহ ও জনমতের প্রশ্ন হিসেবে দেখা উচিত। কিন্তু সন্দেহ তৈরি হওয়ার কারণ আছে: আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে ছিল, বিএনপি বড় সুবিধা পেয়েছে, ভারত নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহ দেখিয়েছে, আর ক্ষমতার পালাবদলের পরও পুরনো দুর্নীতি ও দখলদারির সংস্কৃতি ভাঙার শক্ত প্রমাণ এখনো জনগণ দেখছে না।

বাংলাদেশের মানুষের ভয় এখানেই। একদিকে জামায়াতের উত্থান, অন্যদিকে বিএনপির ক্ষমতার বাস্তববাদী সমঝোতা—এই দুইয়ের মাঝখানে হারিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের অধিকার, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা, নারীর স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং মুক্তিযুদ্ধের মানবিক চেতনা।

রাজনীতি যদি জনগণকে মুক্ত না করে, তবে সেটি শুধু ক্ষমতার ব্যবসা। ধর্ম যদি ন্যায়বিচার শেখানোর বদলে ক্ষমতার সিঁড়ি হয়, তবে সেটি ধর্মেরও অপমান। আর নির্বাচন যদি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন না করে, তবে ব্যালট বাক্স থেকেও গণতন্ত্র জন্মায় না জন্ম নেয় নতুন হতাশা।

বাংলাদেশের দরকার এমন রাজনীতি, যেখানে বিএনপি ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ হবে না, জামায়াত ধর্মের নামে উগ্রতার ছায়া বিস্তার করবে না, আর আওয়ামী লীগের পুরনো দমননীতির জায়গায় নতুন দমননীতি আসবে না।