বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নতুন কিছু নয়। কিন্তু কিছু হত্যাকাণ্ড শুধু একজন মানুষের মৃত্যু না পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার চরিত্র উন্মোচন করে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও তরুণ রাজনৈতিক কর্মী শরীফ ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ড তেমনই একটি ঘটনা।
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচারণার সময় ঢাকায় সশস্ত্র হামলায় গুরুতর আহত হন হাদী। পরে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। রয়টার্স, এপি, ল্য মঁদ, দ্য ডেইলি স্টার ও টিবিএসসহ দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি বড় রাজনৈতিক সংকট হিসেবে প্রকাশিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এত বড় আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও কেন অন্ধকারে?
বাস্তবতা হলো, এই মামলায় ‘বিচারের প্রতিশ্রুতি’ যত দ্রুত এসেছে, তদন্ত ততটাই ধীরগতিতে এগোচ্ছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ঘোষণা দিয়েছিলেন, মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হবে এবং ৯০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার চেষ্টা হবে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও এটিকে ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ মামলা হিসেবে উল্লেখ করেন।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। ঢাকা ট্রিবিউন এবং টিবিএস-এর ধারাবাহিক প্রতিবেদনে জানা যায়, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন একের পর এক পেছানো হয়েছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬ বার, পরে ৭ বার, তারপর ১০ বার এবং এপ্রিল নাগাদ ১১ বার তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার তারিখ পিছিয়েছে সিআইডি। একটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডে ১১ বার তদন্ত পেছানো শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি জনগণের আস্থার ওপর সরাসরি আঘাত।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ইনকিলাব মঞ্চ নিজেই পুলিশের চার্জশিটে অসন্তোষ প্রকাশ করে ‘নারাজি আবেদন’ দিয়ে পুনঃতদন্ত দাবি করেছে। অর্থাৎ নিহতের সহকর্মীরাও তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
টিবিএস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদের স্ত্রী, শ্যালক ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। অন্যদিকে এপি জানায়, দুই সন্দেহভাজন ভারতে আটক রয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকার তাদের ফেরত আনার জন্য কূটনৈতিক আলোচনা চালাচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও মূল প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি কারা পরিকল্পনা করেছিল? কারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে? কারা তদন্তকে ধীর করছে? আর কেন এখন ধীরে ধীরে পুরো ঘটনাকে ‘স্বাভাবিক’ বানিয়ে ফেলা হচ্ছে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু হত্যাকাণ্ড সময়ের সঙ্গে চাপা পড়ে গেছে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যেমন ১২৪ বারের বেশি পেছানো হয়েছে, তেমনি ওসমান হাদী হত্যাও কি একই অন্ধকারে হারিয়ে যাবে? সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো- সরকার, বিরোধী দল ও মিডিয়ার একটি অংশ ধীরে ধীরে এই ঘটনাকে জনআলোচনা থেকে সরিয়ে নিচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, হাদীর মৃত্যুর পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায়। কিন্তু আজ সেই ক্ষোভ আর রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থান কোথায়? যখন একটি রাষ্ট্র রাজনৈতিক হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে পারে না, তখন জনগণ বুঝে যায় আইন সবার জন্য সমান নয়। আর যখন জনগণ এই বিশ্বাস হারায়, তখন শুধু একটি মামলা ব্যর্থ হয় না; পুরো রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের মানুষ এখন শুধু হত্যাকারীকে নয়, বরং ভয় পাচ্ছে বিচারহীনতাকে। কারণ তারা দেখছে, এই দেশে সময়কে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সময় পেরিয়ে গেলে ক্ষোভ কমে যায়, মিডিয়া নতুন ইস্যু খুঁজে নেয়, রাজনীতি নতুন স্লোগান তোলে, আর পুরনো রক্ত শুকিয়ে যায় রাষ্ট্রের নথির ভেতরে।
ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের জন্য একটি পরীক্ষা ছিল, যেখানে রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ব্যর্থ। কারণ বিচার শুধু আদালতের রায় নয়, বিচার হলো রাষ্ট্রের সদিচ্ছার প্রমাণ। যেখানে ১১ বার তদন্ত পিছিয়ে যায়, সেখানে জনগণ প্রশ্ন তুলবেই রাষ্ট্র কি সত্যিই বিচার চায়, নাকি শুধু চায় মানুষ ঘটনাটি ভুলে যাক?
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন