আজ থেকে ৭৭ বছর আগে মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন আইন ও সনদে সব মানুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু উন্নত বা উন্নয়নশীল সব রাষ্ট্রেরই পরিবার, কর্মক্ষেত্র তথা সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে চরম বৈষম্য আজও দৃশ্যমান। সময়ের প্রয়োজনে নারীর অধিকার রক্ষায় জাতিসংঘ ১৯৭৯ সালে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) গ্রহণ করে।
বিশ্বের ১৮৯টি দেশের মতো বাংলাদেশও এই সনদে স্বাক্ষর করেছে। অথচ বাংলাদেশের মতো এই দেশে নারী তথা কন্যাশিশুকে যেন আজও বোঝা মনে করা হয়। সমপ্রতি দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার বাড়লেও নারীর প্রতি নানামুখী সহিংসতা তথা বৈষম্য নতুন করে উদ্বেগজনকভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।
বর্তমানে বিশ্বে বেশ কয়েকটি স্থানে বড় ধরনের যুদ্ধ ও সংঘাত চলছে। তাদের মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন, গাজা (ইসরাইল-ফিলিস্তিন), এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলকেন্দ্রিক উত্তেজনা অন্যতম।
এ ছাড়া ইয়েমেন, সুদান, সোমালিয়া এবং সিরিয়াতে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ বিদ্যমান। এসবের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিকার হচ্ছে বাংলাদেশসহ প্রায় পুরো বিশ্ব! শিক্ষার্থীরা ও তাদের অভিভাবকরা একটা কঠিন ও অস্থির সময় পার করছে। সীমিত সম্পদ আর সীমাহীন দুর্ভোগকে সঙ্গে নিয়ে দিনাতিপাত করছে অনেক কিশোরীর পিতামাতা। একদিকে অর্থনৈতিক দূর্দশা আর অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা।
সামগ্রিকভাবে হতাশার চাদর গায়ে জড়িয়ে ইতোমধ্যে অনেক তরুণ-তরুণী মরণ নেশায় আসক্ত হয়েছে।অনেকে আবার আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে অবেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী যখন হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তখন বিষয়টি সচেতন মহলকে নতুন করে অস্থির করে তুলেছে। পাশাপাশি, সামাজিক নিরাপত্তা আর যৌতুকের কড়াল গ্রাস থেকে রক্ষা পেতে গ্রামীণ-শহুরে বাস করা অনেক অভিভাবক তাদের কিশোর বয়সি কন্যাশিশুদের ‘বিয়ে’ দিচ্ছে।
অন্যভাবে বলা যায়, মা-বাবাই যেন সজ্ঞানে তাদের সন্তানদের মৃত্যুকূপে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় (২০২৪-২৫) দেখা গেছে, বাল্যবিয়ের হার এখনো আগের (২০২০ এর আগের) তুলনায় উদ্বেগজনক উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এবং ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালেও ১৫ বছরের নিচে মেয়েদের বিয়ের হার বেড়ে ৬.৫ শতাংশ হয়েছে, যা ২০১৮ সালে ছিল ৪.৬ শতাংশ।
এ ছাড়া, ইউনিসেফ ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের তথ্য মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাল্যবিয়ের দিক দিয়ে বাংলাদেশ এখন শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে এবং এটি বর্তমানে একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। আর এই বাল্যবিয়ে সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম দায় স্বয়ং পিতামাতার।
বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাসমূহ ও বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) এবং ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার খুবই উদ্বেগজনক এবং বিশ্বে যা অষ্টম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমরা যতটুকু বুঝতে পারি তার থেকেও বড় সত্যি হলো- এ দেশের অর্ধেকের বেশি মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অথবা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার অভাবে মা-বাবারা বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠীর আর্থিক সহায়তায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাসমূহ গত আশির দশক থেকে গণসচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন যাচ্ছে। দুঃখের বিষয় হলো- নানাবিধ ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়লেও বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে তেমন উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়নি। অজানা কারণে এহেন সমস্যাটি কোনোভাবেই মোকাবিলা করা যাচ্ছেনা।
বাল্যবিয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সাধারণত দারিদ্র্যতাকে ধরা হয়। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণার রিপোর্টে জানা গেছে, দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের ৩০ শতাংশের বাল্যবিয়ের হার প্রায় ৩০ শতাংশ। এতেই প্রতীয়মান হয়, বাল্যবিয়ে সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে কেবল অর্থনৈতিক সমস্যাই মূল কথা নয় বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা ও স্বপ্রণোদিত পদক্ষেপ অনেক বেশি জরুরি।
সম্প্রতি শিশু মডেল সিমরিন লুবাবা যে কিনা বাল্যবিয়ে প্রতিরাধে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, অথচ সেই কিনা মাত্র ১৫ বছর বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসে পুরো জাতিকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। একবিংশ শতাব্দীর এই মোক্ষম সময়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যেন দুম করে স্থবির হয়ে গেল অথবা শৈশবের পিচ্ছিল বাঁশে বানরের ওঠানামা অঙ্কের মতো! আমরা যতটাই এগিয়েছি, ততটাই কি পিছিয়ে গেলাম? প্রগতিশীলতার ছত্রছায়ায় কুসংস্করতায় আচ্ছন্ন হয়ে বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক ব্যাধিকে সমর্থন করা কোনো প্রত্যাশিত ঘটনা হতে পারেনা!
অবিবেচকের মতো একজন কিশোরী তথা শিশুকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেয়া মানে তার শৈশব কেড়ে নেয়া, অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেয়া তার সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। ফলে এটি একটি জাতিকে পিছিয়ে দেয়ার নামান্তর! সুতরাং, অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে দেয়া কেবল লিঙ্গবৈষম্য ও সহিংসতাই নয়, বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল! কেননা, একজন শিশুর পক্ষে বিয়ে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারা ও মতামত প্রকাশ করা অত সহজ কথা নয়। বাল্যবিয়ের ফলে দরিদ্রতা বৃদ্ধি পায়, স্বাস্থ্যহানি ঘটে, যা পুরো দেশের উন্নয়নে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
এক জরিপে দেখা যায়, যেসব নারী ২০ বছরের পর বিয়ে করে তারা অন্য নারীদের মধ্যে মোট আয়ের বৃদ্ধিতে দেশের জিডিপি ৩.৮৭% বৃদ্ধি করতে পারে (ইউনিসেফ)। কৈশোর তথা শিশু বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যহানি ঘটার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। ফলে পুরুষ জীবনসঙ্গীর অন্য নারীর প্রতি আসক্তি বেড়ে যায়! এ ছাড়া, একজন কিশোরী-মায়ের কোলে নবাগত শিশু এলে তাকে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক সমৃদ্ধ করতে পারা অত সহজ কথা নয়; আর তাই প্রজন্মান্তরে সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হতে থাকে।
সম্প্রতি বিয়ে করেছে এমন কিশোরী বধূদের বিভিন্ন কেস স্টাডির মাধ্যমে জানা যায়, কমপক্ষে শতকরা ৯৫ ভাগ কিশোরী কোনো না কোনো সমস্যায় ভুগছে এবং যারা এমন বৈবাহিক/দাম্পত্য জীবন থেকে পরিত্রাণ পেতে চান। IMAGE (Initiative for Married Adolescent Girl’s Empowerment) Plus Project--এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা যায়, উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে চর এলাকায় তাদের কর্ম এলাকার লক্ষিত জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানায়। তারা এতটুকু সুযোগ পেলে বিয়ে নামক যন্ত্রণা থেকে নিজেকে মুক্ত করে জীবনকে নতুন করে সাজাতে চায়!
আজ এই কঠিন সময়ে আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া খুব জরুরি, ‘যে শিশুরা বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে, তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো বিকল্প নেই এবং শিশুদের আরও শিক্ষামুখী করে তোলার জন্য সমন্বিত উপায়ে কাজ করা খুবই জরুরি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও নানামুখী বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে আগামী দুই বছরে ৯০ লাখ মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছেন।
এরিকা হল, জনৈক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, সাউথ সুদান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে! ইউনিসেফের অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই ৩৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের মধ্যে ৭৪ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। এ দেশে বাল্যবিয়ের গড় হার ৬৫ শতাংশ। ১৫ বছরের কম বয়সি মেয়েদের বিয়ের এই হার বিশ্বে সর্বোচ্চ। প্রতিবেশী দেশ ভারতের বাল্যবিয়ের গড় হার ৫০ শতাংশ, নেপালে ৫৭ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ৫৪ শতাংশ।
বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাল্যবিয়ের শিকার মানুষ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ না হওয়ায় ব্যক্তিত্ব সমস্যায় ভুগতে থাকে। ফলে তারা একসময় রাষ্ট্রের জন্যও বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া, সারা বিশ্বে নারী ও কিশোরীদের প্রতি ১৯ ধরনের বৈষম্যমূলক ও ক্ষতিকর চর্চা রয়েছে। এর মধ্যে বাল্যবিয়ে এবং মেয়ে সন্তানের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বাংলাদেশে প্রকট। সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশনসহ নানা উন্নয়ন সংস্থার পক্ষ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতির বিবেচনায়, আমাদের এখনই যথাযথভাবে বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে মেয়েদের জীবন তথা শিশুর নির্মল ভবিষ্যৎ ও শিক্ষার অধিকার সুরক্ষা করা যায় এবং তাদের প্রতি সহিংসতা ও শোষণের মাত্রা দ্রুত হ্রাস করা যায়। বৈশ্বিক এই ক্রান্তি লগ্নে শিশুদের সুদিন ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের প্রত্যেকের অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়া খুব জরুরি। সময়ের প্রয়োজনে এবং জাতীয় স্বার্থে সব অনিয়ম-অন্যায়-অনাচার-বৈষম্য-লিঙ্গ সহিংসতা দূরীকরণে সবার ঐকমত্য সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন। ভবিষ্যতের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার মনে একটাই প্রতিজ্ঞা হোক, ‘আর নয় বাল্যবিয়ে, বাড়বে তারা হাসিমুখে”!
লেখক : কো-অর্ডিনেটর, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড চাইল্ড প্রটেকশন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন