ছায়ানট ও জয়ন্ত রায়: সংস্কৃতির দীপ্ত পথচলা

শিমুল আহসান প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম
ছায়ানট ও জয়ন্ত রায়: সংস্কৃতির দীপ্ত পথচলা

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ছায়ানট একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। শুদ্ধ সংগীতচর্চা, বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিকাশে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। এই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত আছেন জয়ন্ত রায়। ছায়ানটের কার্যকরী সংসদের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে তিনি সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি মঞ্চ সঞ্চালনা, আবৃত্তি এবং শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।

জয়ন্ত রায় ছায়ানটের বিভিন্ন একক ও যৌথ সংগীত সন্ধ্যা, প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের নিয়ে আয়োজিত উৎসব এবং বিশেষ পরিবেশনাগুলোতে দক্ষতার সঙ্গে সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা, সংগীত সম্পর্কে গভীর জ্ঞান এবং পরিবেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কথনশৈলী দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।

আবৃত্তিশিল্পী হিসেবেও তিনি ছায়ানটের বিভিন্ন আয়োজনে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। রবীন্দ্র-উৎসবের মঞ্চে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ থেকে “কালের যাত্রার ধ্বনি” কিংবা নজরুল-উৎসবে কাজী নজরুল ইসলামের “নারী” কবিতার আবৃত্তি তাঁর কণ্ঠে এক ভিন্ন মাত্রা পায়। তাঁর আবৃত্তিতে শব্দের ব্যঞ্জনা, আবেগ ও ভাবপ্রকাশ শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

শুধু সংগঠক বা আবৃত্তিশিল্পী নন, শাস্ত্রীয় সংগীতের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণেও জয়ন্ত রায়ের রয়েছে বিশেষ দক্ষতা। রাগভিত্তিক সংগীতের কাঠামো, সময়ভিত্তিক রাগের বৈশিষ্ট্য এবং পরিবেশনার উপযোগিতা সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান রয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের অনবদ্য গীতি-আলেখ্য ‘যাম-যোজনায় কড়ি মধ্যম’ অনুসরণে ছায়ানট আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি নজরুল সংগীতে ব্যবহৃত প্রহরভিত্তিক বিভিন্ন রাগ- যেমন ললিত, গৌড় সারং, পূরবীসহ অন্যান্য রাগের প্রকৃতি ও কাঠামোগত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন।

রাগের স্বর, সুর, তাল ও লয়ের পরিবর্তন শ্রোতাদের কাছে সহজবোধ্য করে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর উপস্থাপনা বিশেষ প্রশংসা অর্জন করেছে। শাস্ত্রীয় সংগীতের জটিল বিষয়গুলোকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার দক্ষতা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

জয়ন্ত রায় মূলত নজরুল সংগীত ও উচ্চাঙ্গ সংগীতের একজন নিবেদিতপ্রাণ অনুরাগী। নজরুল সংগীতের শুদ্ধ স্বরলিপি, সুরের বিশুদ্ধতা এবং পরিবেশনার সঠিক ধারা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত যত্নশীল। ছায়ানটের বৈশাখী উৎসব, নজরুল জয়ন্তী, শারদীয় উৎসবসহ বিভিন্ন বড় আয়োজনে কোন সময়ে কোন রাগের পরিবেশনা উপযুক্ত, তা নিয়ে তিনি শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন।

শুদ্ধ সংগীতচর্চায় নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করা, স্বরলিপি বিশ্লেষণ, আবৃত্তি ও সংগীতের সমন্বিত উপস্থাপনা তৈরিতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। ছায়ানটের বার্ষিক নজরুল উৎসবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রাগভিত্তিক ও ভক্তিমূলক গান পরিবেশনার পরিকল্পনা ও পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

সংগীত ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর নিবেদন তাঁকে ছায়ানটের একজন দক্ষ, নিবেদিতপ্রাণ ও অগ্রণী সংগঠক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ছায়ানটের নীতি, ঐতিহ্য এবং শুদ্ধ সংগীতচর্চার প্রসারে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নেপথ্যে ও সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

আত্মপ্রচার থেকে দূরে থেকে নীরবে কাজ করাই জয়ন্ত রায়ের স্বভাব। প্রচারের আলোয় না থেকেও বিশুদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর অবদান তাঁকে সংস্কৃতিমহলে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

জয়ন্ত রায়ের সংগীতচর্চার ভিত্তি গড়ে উঠেছে শৈশব থেকেই। বাংলাদেশের একটি সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকেই তিনি শুদ্ধ সংগীত ও সাংস্কৃতিক চর্চার আবহে বেড়ে ওঠেন। শৈশবেই শুরু করেন শাস্ত্রীয় সংগীত ও নজরুল গীতির তালিম। পরবর্তীতে ছায়ানটসহ দেশের প্রথিতযশা সংগীতগুরুদের সান্নিধ্যে এসে সুর ও রাগের ওপর গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সংগীতের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় দিকেই তিনি সমৃদ্ধ জ্ঞান অর্জন করেছেন। এই জ্ঞান তাঁকে একজন দক্ষ সংগীত বিশ্লেষক, সংগঠক ও সংস্কৃতির নিবেদিত কর্মী হিসেবে গড়ে তুলেছে।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জয়ন্ত রায় এমন এক নাম, যিনি মঞ্চের আলোয় যেমন দক্ষ, তেমনি নেপথ্যের কর্মযজ্ঞেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করছে।

লেখক: শিমুল আহসান, মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট, এলজিইডি-ক্রিলিক।

এম জি