শেখ হাসিনার তিন সাক্ষাৎকারে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক

ওমর ফারুক প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৫, ১১:৩৫ এএম
শেখ হাসিনার তিন সাক্ষাৎকারে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক

একই দিনে তিনটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর বাংলাদেশে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশত্যাগের প্রায় পনেরো মাস পর প্রবাস থেকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারগুলিতে শেখ হাসিনা যেভাবে আগামী জাতীয় নির্বাচন, ভোটাধিকার ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করেছেন তা তার দীর্ঘ শাসনকাল ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করলে বহু প্রশ্ন সামনে আসে।

নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে “লাখো মানুষ ভোট দেবে না”: রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে না দিলে দলটির লাখ লাখ সমর্থক আগামী নির্বাচনে ভোট দেবে না।

তিনি আরও বলেন, একটি কার্যকর রাজনৈতিক সিস্টেম চাইলে আপনি লাখ লাখ মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারেন না।

তার ভাষ্যমতে, পরবর্তী সরকারের অবশ্যই নির্বাচনি বৈধতা থাকা প্রয়োজন—আর সেটি কেবল অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমেই সম্ভব। এই বক্তব্য একদিকে তার দলকে রাজনৈতিকভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে এটি দেশীয় রাজনীতিতে “নৈতিক প্রতিশোধ” এর বিতর্কও উসকে দিয়েছে।

শেখ হাসিনার এই বক্তব্য অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। কারণ তার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় নির্বাচনের প্রতিটিই ব্যাপক বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

২০১৪ সালে ১৫৪টি আসনে ভোট ছাড়াই প্রার্থী বিজয়ী ঘোষিত হয়, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালটবাক্স ভর্তি করার অভিযোগ ওঠে, আর ২০২৪ সালের নির্বাচনকে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা “অংশগ্রহণহীন” বলে আখ্যা দেন। এই তিনটি ঘটনার স্মৃতি এখনও দেশের গণতান্ত্রিক চেতনায় তাজা।

বিএনপি, গণঅধিকার পরিষদ ও বামপন্থী দলগুলোর নেতারা একে একে প্রশ্ন তুলেছেন “যিনি তিন তিনটি নির্বাচন জনগণের অংশগ্রহণবিহীন করেছেন, তার মুখে ভোটাধিকারের কথা কতটা মানানসই?”

আত্মসমালোচনার অনুপস্থিতি: তিন সাক্ষাৎকারের কোনোটিতেই শেখ হাসিনা নিজের শাসনামলের বিতর্ক, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা রাজনৈতিক দমননীতি সম্পর্কে অনুশোচনামূলক মন্তব্য করেননি।

তিনি বলেছেন, তার সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা” ও “ষড়যন্ত্রমূলক”।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পরও যদি একজন নেতা নিজের সিদ্ধান্ত ও নীতির প্রতি সামান্য আত্মসমালোচনা না দেখান, তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি বিপজ্জনক বার্তা বহন করে।

একজন প্রবাসী সাবেক নেতার কাছ থেকে জনগণ অন্তত এই স্বীকারোক্তিটা আশা করেছিল যে তার আমলেই গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার ও “সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি”: এই সাক্ষাৎকারগুলো প্রকাশিত হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন দেশের অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচন ঘিরে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। 

তিনি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বলেছেন, নির্বাচন বানচালে ভেতর থেকে, বাইরে থেকে অনেক শক্তি কাজ করবে। ছোটখাটো নয়, বড় শক্তির কাছ থেকেও আক্রমণ আসতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই “বড় শক্তি” বলতে তিনি ইঙ্গিত করেছেন সেই রাজনৈতিক নেটওয়ার্কগুলোকেই, যারা পূর্ববর্তী সরকারের পতনের পর এখন প্রবাসে সংগঠিত হচ্ছে। ফলে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলো শুধু রাজনৈতিক মতপ্রকাশ নয়, বরং আসন্ন নির্বাচনের পূর্বলক্ষণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ একটি নিষিদ্ধ সংগঠন। তার অঙ্গসংগঠনগুলোও নিষিদ্ধ ঘোষিত, এবং অধিকাংশ শীর্ষ নেতা বিদেশে বা মামলার মুখে।

প্রশ্ন উঠছে এই অবস্থায় শেখ হাসিনা যে “আমরা নির্বাচনে অংশ নেবার সুযোগ চাই” বলেছেন, সেটি কতটা বাস্তবসম্মত?

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের ভাষায়, তিনটি নির্বাচন প্রহসনে পরিণত করে গণরোষে পালিয়ে যাওয়া নেত্রীর মুখে এই কথা শোভা পায় না।

অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, শেখ হাসিনাই প্রমাণ করেছেন একটি দল ছাড়াও নির্বাচন হতে পারে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অবস্থান: শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকারগুলো প্রকাশ করেছে এক সূক্ষ্ম কূটনৈতিক কৌশলও। প্রবাসে অবস্থানরত অবস্থায় তিনি একদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিজের বক্তব্য ছড়িয়ে দিতে চান, অন্যদিকে তা দিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, যেন আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলের মনোভাব এখনো স্পষ্ট নয়। বেশিরভাগ পশ্চিমা গণমাধ্যম তার বক্তব্যকে (আত্মরক্ষামূলক ব্যাখ্যা) হিসেবে দেখছে, যেখানে অনুশোচনার চেয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রবণতা বেশি।

নেতৃত্ব নয়, উত্তরাধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশ: শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে, তিনি এখনো নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় ফিরে আসতে চান, নাকি শুধু রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বাঁচাতে চান?

তিনি বলেছেন, আমরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের অন্য দলকে সমর্থন করতে বলছি না।” এই ‘আমরা’ শব্দটি এখন আর একটি সংগঠনের নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ছায়ার প্রতীক যা ইতিহাসে আছে, কিন্তু রাষ্ট্রের কাঠামোতে নেই।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ একদিকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রক্রিয়া গঠন করা, অন্যদিকে অতীতের দোষারোপে আটকে থাকা।

কিন্তু শেখ হাসিনার বক্তব্যে যদি অতীতের ভুলের স্বীকৃতি না থাকে, তবে নতুন ভবিষ্যৎ দাবি করাটাই হয়তো রাজনৈতিক সাহসের বদলে কৌশলের অংশ হয়ে থাকবে।


লেখক: গণমাধ্যম কর্মী।

জেএইচআর