বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরোধ, চাপানউতোর আর সমালোচনার ধারাকে নতুন মাত্রায় তীব্র করে দিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেছেন, দুর্নীতিতে তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া দলকে জনগণ আর ভোট দেবে না। যাদের নেতৃত্বে রাষ্ট্র বারবার বিপর্যস্ত হয়েছে, তারা এখনো ক্ষমতার স্বপ্ন দেখছে এটাই দেশের জন্য বড় ঝুঁকি।
শনিবার সন্ধ্যায় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গুণবতী ইউনিয়নে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
গুণবতী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে স্থানীয় জামায়াতের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এ জনসভায় হাজারো মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সমাবেশস্থলে বিকেল থেকেই দলীয় নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে যোগ দিতে শুরু করেন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর এলাকায় বড় পরিসরে কোনো প্রকাশ্য জনসমাবেশ হওয়ায় তা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। জনতার ভিড় যখন মাঠের চারপাশ ছাপিয়ে রাস্তা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, তখন মঞ্চে উঠে বক্তব্য দেন ডা. তাহের।
নিজের বক্তব্যে তিনি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংস্কার উদ্যোগকে ঘিরে চলমান বিতর্কের প্রসঙ্গ তোলেন। তাহের বলেন, যে সংস্কার দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পরিষ্কার পথে নিতে পারে, তা প্রত্যাখ্যান মানে আবারও অন্ধকারে ফেরা। আমরা ১৫ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি—সংকীর্ণ রাজনীতি ও ক্ষমতার একচ্ছত্র চর্চা কীভাবে রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই যারা আজও সেই পুরনো পথেই হাঁটতে চায়, তারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষ এখন রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সচেতন। তারা আর বিভ্রান্ত হবে না। কারা উন্নয়ন চায়, কারা শান্তি চায় এবং কারা শুধু ক্ষমতার লোভে রাষ্ট্রযন্ত্র দখলে রাখতে চায়—তা জনগণ বুঝে গেছে।
বিএনপির অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে ডা. তাহের বলেন, বিএনপি নিঃসন্দেহে বড় দল। কিন্তু বড় দল হলেই জনগণের আস্থা ধরে রাখা যায় না। গত দুই দশকের রাজনৈতিক ব্যর্থতা, সংঘাতপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং দুর্নীতির রেকর্ড তাদের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছে।
তাহের দাবি করেন, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের মানুষের আস্থার শীর্ষে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। কারণ আমরা মাঠে আছি, মানুষের পাশে আছি, শুধু ক্ষমতার রাজনীতি নয়—সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতি করছি।
জনসভায় শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি সংঘাতমুক্ত হতে হবে। ক্ষমতায় যেই থাকুক, রাজনৈতিক ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। হত্যা বা লুটপাট—এই অপসংস্কৃতি আর চলতে দেওয়া হবে না। সব দলই তাদের সাংবিধানিক অধিকার অনুযায়ী স্বাধীনভাবে রাজনীতি করবে—এ প্রতিশ্রুতি আমরা দিচ্ছি।
তিনি আরও জানান, কোনো রাজনৈতিক দল বা মতের লোকজনকে শত্রু মনে করার নীতি জামায়াতের নয়। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, তবে তা হবে শান্তিপূর্ণ ও নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন পদ্ধতিতে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা ও সমঅধিকারের বিষয়েও বক্তব্য দেন ডা. তাহের। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সব ধর্মের মানুষের দেশ। এখানে সনাতন ধর্মাবলম্বী হোন বা অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী—সবাই শান্তি ও নিরাপত্তায় বসবাস করবেন। আমরা এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে কোনো নাগরিক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হবে না।
তার এ বক্তব্যে মাঠে উপস্থিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কয়েকজনও সমর্থন জানান বলে আয়োজকদের দাবি।
জনসভায় উপস্থিত ভোটারদের উদ্দেশে ডা. তাহের বলেন, বিএনপি করা আপনার রাজনৈতিক অধিকার। মতবিরোধ থাকা স্বাভাবিক। তবে এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে আপনার ভোট আমাকে দেবেন—এই বিশ্বাস আমি রাখি।
তিনি উল্লেখ করেন, যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসহ স্থানীয় উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। চৌদ্দগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে স্থবির উন্নয়নের যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো নিরসনে তিনি দ্রুত উদ্যোগ নেবেন বলে আশ্বাস দেন।
সমাবেশ আয়োজকরা জানান, গত প্রায় ১৭ বছর ধরে এলাকায় বড় কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ হয়নি। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত ও নিষেধাজ্ঞার পরিবেশের কারণে বড় ধরনের গণজমায়েতও করা যায়নি। এবার পরিস্থিতি বদলানোয় জনসমাগম প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হয়েছে।
মাঠে আসা কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ ভোটার বলেন, বহু বছর ধরে এমন পরিবেশ দেখেননি। কেউ কেউ মনে করেন, এলাকার রাজনীতিতে এই সমাবেশ একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
ডা. আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের বক্তৃতা শুধু দলীয় সমর্থকদের জন্য নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। দুর্নীতি, সংস্কার, গণতন্ত্র, উন্নয়ন—সব বিষয়ের ওপর তার সুনির্দিষ্ট বক্তব্য নতুন বিতর্ক ও বিশ্লেষণের জন্ম দিতে পারে। জনসভা শেষে নেতাকর্মীরা শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে মিছিল নিয়ে স্থান ত্যাগ করেন।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন