জামায়াত আমির

অতীতের তিক্ততা পেছনে ফেলে ঐক্যের বাংলাদেশ: জামায়াত আমিরের নতুন রাজনৈতিক দর্শন

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৮, ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
অতীতের তিক্ততা পেছনে ফেলে ঐক্যের বাংলাদেশ: জামায়াত আমিরের নতুন রাজনৈতিক দর্শন
ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কাদা ছোঁড়াছুড়ি আর অতীত নিয়ে একে অপরকে আক্রমণ করার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। তবে সময় বদলেছে, বদলেছে জনআকাঙ্ক্ষা। সেই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তার দল আর পেছনের দিকে তাকাতে চায় না। প্রতিহিংসার রাজনীতিতে ইতি টেনে তারা এখন সামনের দিকে তাকাতে বদ্ধপরিকর।

বুধবার রাজধানীর উত্তর কাফরুল হাইস্কুল সংলগ্ন এলাকায় জনসাধারণের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, অতীত নিয়ে আমরা আর কামড়াকামড়ি করতে চাই না। আমরা চাই একটি ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল জাতি, যেখানে বিভেদ নয় বরং ইনসাফ বা ন্যায়বিচার হবে মূল ভিত্তি।

ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে এক ধরনের রাজনৈতিক উদারতা। তিনি মনে করেন, দশকের পর দশক ধরে প্রতিহিংসার যে রাজনীতি এ দেশে চলেছে, তাতে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষেরই ক্ষতি হয়েছে। জাতিকে বিভক্ত করে রাখার এই খেলা আর চলতে দেওয়া যায় না। তার ভাষায়, “অতীতের তেতো স্মৃতি নিয়ে পড়ে থাকলে আমরা কখনো সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারব না। জাতিকে বিভক্ত করার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই; আমরা বরং সবাইকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে চাই।

এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং দেশের বর্তমান সংকটময় মুহূর্তে একটি ‘হিলিং’ বা ক্ষত নিরাময়ের বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ যখন বারবার বিভাজনের রাজনীতির শিকার হচ্ছে, তখন জামায়াত আমিরের এই সহনশীল অবস্থান জনমনে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছে।

কাফরুল এলাকায় ডা. শফিকুর রহমানের অবস্থান কেবল একজন প্রার্থীর নয়, বরং একজন অভিভাবকের মতো। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে করিয়ে দেন যে, ২০১৮ সাল থেকেই তিনি এই এলাকার মানুষের প্রতিটি সংকটে ও সুখে পাশে ছিলেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে হঠাৎ কোনো সম্পর্ক গড়া তার উদ্দেশ্য নয়। তিনি বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে এই এলাকার মাটি ও মানুষের সাথে আমার গভীর সম্পর্ক। আমি এখানে কেবল ভোট চাইতে আসিনি, বরং এই এলাকার সমস্যাগুলো নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে একটি আধুনিক নগরী উপহার দিতে এসেছি।

বিশেষ করে এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং তরুণ প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়াই তার মূল লক্ষ্য। গণসংযোগের সময় উপস্থিত শিশু-কিশোরদের স্বতঃস্ফূর্ত অভিবাদনে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং তাদের জন্য একটি বাসযোগ্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

জামায়াত আমির তার বক্তব্যে বারবার ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচারের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে একটি জাতি টেকসই হতে পারে না, যদি সেখানে ন্যায়বিচার না থাকে।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অধিকার: সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই তার ইনসাফভিত্তিক সমাজের মূলমন্ত্র।

আধুনিকায়ন: ইসলামের মূল আদর্শকে ধারণ করে কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি রাষ্ট্র গড়া যায়, সেই পথনকশা তিনি তুলে ধরেন।

দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন: ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে একটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় সাধারণত অন্য দলের প্রার্থীদের সমালোচনা করা বা ছোট করার প্রবণতা থাকে। কিন্তু ডা. শফিকুর রহমান এই প্রথা ভেঙে অন্য সকল প্রার্থীকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি আহ্বান জানিয়েছেন যেন সবাই একটি ‘সুষ্ঠু, ভদ্র এবং সুশৃঙ্খল’ প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

তিনি বলেন, “যিনিই যোগ্য হবেন, জনগণ তাকেই বেছে নেবে। আমরা চাই একটি উৎসবমুখর পরিবেশ। জনগণের রায়ের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে এবং সেই রায়কে আমরা সবসময় সম্মান জানাব। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতি তার এই সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি দেশের ভঙ্গুর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি পজিটিভ সিগন্যাল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গণসংযোগের এক পর্যায়ে ডা. শফিকুর রহমান উত্তর কাফরুলের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোঁজখবর নেন। তিনি মনে করেন, একটি শিক্ষিত জাতিই কেবল পারে একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়তে। তিনি ঘোষণা করেন, তার নির্বাচনী এলাকা হবে শিক্ষার মডেল। সেখানে শিক্ষার মানোন্নয়ন, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনা এবং আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে তিনি বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। শিশুদের প্রতি তার স্নেহ এবং তাদের উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়ার বিষয়টি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বক্তব্যের শেষ দিকে ডা. শফিকুর রহমান পুনরায় জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দেন। তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিনের বিভেদ বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে জাতি হিসেবে এক হওয়ার। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশপ্রেমকে উপরে রাখেন। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পরবর্তী এই সময়ে মানুষের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তাকে সম্মান জানিয়ে প্রতিহিংসামুক্ত বাংলাদেশ গড়া এখন সময়ের দাবি।

ডা. শফিকুর রহমানের এই গণসংযোগ কর্মসূচী কেবল ভোটের জন্য ছিল না, বরং তা ছিল মানুষের সাথে হৃদয়ের বন্ধন তৈরির একটি প্রচেষ্টা। ‘অতীত নিয়ে কামড়াকামড়ি না করার‘যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, তা যদি দেশের রাজনৈতিক দলগুলো অনুসরণ করে, তবে বাংলাদেশ সত্যি এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে। বিভেদ ভুলে ঐক্যের রাজনীতিই হোক আগামীর পাথেয় এই বিশ্বাসই প্রতিফলিত হয়েছে জামায়াত আমিরের ভাষ্যে।

মানুষ এখন দেখতে চায়, এই উদারতা এবং সহনশীলতা কেবল নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না কি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সংস্কারের সূচনা করে। উত্তর কাফরুলের রাজপথ থেকে ভেসে আসা এই সম্প্রীতির সুর কতটুকু সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

এএন