জাহাঙ্গীরনগরের ইতিহাস যেন আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে রক্তলাল চোখে রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস। র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন, অবৈধভাবে গাছ কাটা, অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনের দুর্নীতিসহ সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ইতিহাসই যেন এ সবুজ প্রাঙ্গণের মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার মূল পাথেয়। চব্বিশের জুলাইয়ে যেন জাবির আন্দোলনের ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে সবচেয়ে দামি মুকুটটি।
বাংলার হাজার বছরের আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অবিস্মরণীয় অধ্যায় দখল করে আছে চব্বিশ। ১৭ বছর ধরে চলমান আওয়ামী সরকারের ফ্যাসিবাদ, অন্যায়, দুর্নীতি, খুন, গুম, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, চাকরিতে নিয়োগে অস্বচ্ছতা, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ভিন্নমতকে দমন-পীড়ন,বাকস্বাধীনতা হরনসহ হাজারো বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার এক অবিস্মরণীয় ও স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ ঘটেছিল। যার সমাপ্তি হয়েছিল দীর্ঘদিনের দানবীয় ফ্যাসিবাদের পতনের মাধ্যমে। দীর্ঘদিনের ফ্যাসীবাদী, জুলুমবাজ সরকারের পতনের মাধ্যমেই জনগণ একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল চব্বিশের এই জুলাইয়ে।
এ আন্দোলনের সূচনা হয় সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাপদ্ধতির ন্যায্য সংস্কার চেয়ে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের মাধ্যমে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনকে থামাতে অসহনীয় দমন-পীড়নের আশ্রয় নেয় আওয়ামিলীগ সরকার। যার ফলে শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং গণবিক্ষোভে পরিণত হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আন্দোলনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। উত্তরবঙ্গ ও রাজধানীর সংযোগ সড়ক ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত হওয়াই এ বিশ্ববিদ্যালয় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের মাধ্যমে আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিতে থাকে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন স্বৈরাচার সরকার আন্দোলন দমাতে সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী সন্ত্রাসী ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেয়।
অবৈধ ফ্যাসীবাদী আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে স্বৈরাচার পালিত সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ১৫ জুলাই রাত ৭ টা নাগাদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে নৃশংসভাবে সশস্ত্র হামলা চালায়। রামদা, হকিস্টিক, হাতুড়িসহ দেশীয় অস্ত্রসস্ত্রের আঘাতে আহত হয় নারী শিক্ষার্থীসহ অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের নৃশংস এ হামলার বিচারের দাবিতে উপাচার্যের বাসভবনে অবস্থান নেয়। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক নুরুল আলম অযৌক্তিকভাবে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। শিক্ষার্থীরা বিচারের চূড়ান্ত আশ্বাস না পেয়ে বাসভবনের সামনে আন্দোলন জারি রাখে। এ সময় রাত এগারটা নাগাদ সাংবাদিকদের কাছে খবর আসে ছাত্রলীগ বহিরাগত সন্ত্রাসীদের এনে চূড়ান্ত সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবুও শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
রাত গভীর হওয়াই শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমতে থাকে। তবুও শতাধিক শিক্ষার্থী তাদের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যায়।
এদিকে রাত ১২ টা নাগাদ বহিরাগত সন্ত্রাসীসহ সশস্ত্র সাজে সজ্জিত হয়ে ছাত্রলীগ তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল থেকে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আক্তারুজ্জামান সোহেল ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটনের নেতৃত্বে উপাচার্যের বাসভবনের দিকে যাত্রা করে। এ খবর শুনে আন্দোলনকারীরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং উপাচার্যের বাসার গেইট টপকিয়ে বাসভবনের ভেতরে অবস্থান নেয়। এরই মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে আসে পুলিশ। তারা একইসাথে গেটের বাইরে এবং ভেতরে অবস্থান করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আশ্বস্ত করে।
রাত ১ টা নাগাদ নি:শব্দে আগ্নেয়াস্ত্র, রামদা, হকিস্টিক, ককটেল, পেট্রলবোমাসহ পাঁচ শতাধিক সন্ত্রাসী নিয়ে বাসভবনের সামনে আসে ছাত্রলীগ। শিক্ষার্থীদেরকে বাসভবনে অবরুদ্ধ করে স্লোগান দিতে থাকে 'তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি, হই হই রই রই জামাত-শিবির গেলি কই' একাত্তরের বাংলায়, রাজাকারের ঠাঁই নাই'। স্লোগানের সাথে মুহুর্মুহু পেট্রোল বোমা, ককটেল, কাচের বোতল নিক্ষেপ করে রাতভোর হামলা চালিয়ে বাসভবনকে রণক্ষেত্রে পরিণত করে ছাত্রলীগ। সরকারি পেটোয়া পুলিশ বাহিনী পূর্বে নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও ছাত্রলীগের আক্রমণের সময় নীরব ভূমিকা পালন করে। হামলার শিকার হন নারী ও শিক্ষকসহ শতাধিক শিক্ষার্থী। সন্ত্রাসীরা দুইদিক থেকে গেইট ভেঙ্গে চূড়ান্ত মারণ হামলা চালানোর চেষ্টা করলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একাংশ আল্লাহুআকবর বলে তাদেরকে প্রতিরোধে ঝাপিয়ে পড়ে। নারীসহ নিরস্ত্র আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে থাকে।
এরই মধ্যে হলে হলে ছাত্রলীগের এ নৃশংস হামলার খবর পৌঁছালে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। তারা তাদের ভাই-বোন-বন্ধুদেরকে সন্ত্রাসীদের কবল থেকে বাঁচাতে একত্রিত হয়ে ভিসির বাসভবনে যাত্রা শুরু করে। বাসভবন সংলগ্ন এলাকায় ছাত্রলীগের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয় শিক্ষার্থীদের। অবশেষে রাতভোর হামলার পর শেষরাতে শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক প্রতিরোধের মুখে ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে যায় ছাত্রলীগ। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেচে যাওয়া শিক্ষার্থীরা অশ্রুনয়নে জড়িয়ে ধরে বন্ধুদেরকে।
এ সময় ছাত্রলীগের হামলার সময়ে নির্বিকার থাকা পুলিশ নির্বিচারে গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে আসা পুলিশই অবতরণ করে হামলাকারীর ভূমিকায়, গুলিবিদ্ধ হয় উপস্থিত সাংবাদিকসহ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। পুলিশি হামলার কবল থেকে বের হয়ে শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে ক্যাম্পাসকে ছাত্রলীগ মুক্ত ঘোষণা করে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে যায়। সারা বাংলাদেশে প্রথম সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ মুক্ত হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে দিনটিকে স্মরণীয় রাখতে ১৫ জুলাইকে 'কালরাত' ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন