স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর বার্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামর্থ্যের অগ্নিপরীক্ষা

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২৬, ০৪:২৫ পিএম
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর বার্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামর্থ্যের অগ্নিপরীক্ষা

বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় ও স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবে দাঁড়িয়েছে জননিরাপত্তা। দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক মেরুকরণের পর রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি পারবে একটি নিরাপদ ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ উপহার দিতে? বিশেষ করে নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সন্ত্রাস নির্মূলের সাম্প্রতিক প্রতিশ্রুতি এবং কঠোর দিকনির্দেশনার পর এই আলোচনা এখন তুঙ্গে।

রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সন্ত্রাসবাদের শিকড় উপড়ে ফেলা কি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে? ২০২৬ সালের এই উত্তাল সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বর্তমান রূপরেখা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের এই বিশেষ অনুসন্ধান।

সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, সন্ত্রাসীর কোনো দল নেই, পরিচয় নেই। যে হাত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে, সেই হাতকে আইনের আওতায় আনতে সরকার বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবে না।

মন্ত্রীর এই বার্তার তিনটি প্রধান দিক ছিল। পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনীকে রাজনৈতিক লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করার সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধের ঘোষণা। বিশেষ করে পরিবহন খাত ও শিল্পাঞ্চলে নব্য চাঁদাবাজদের দমনে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন। অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধে দেশব্যাপী চিরুনি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ যতটাই শক্তিশালী হোক না কেন, তা বাস্তবায়নের ভার যাদের ওপর—সেই পুলিশ ও বিশেষায়িত বাহিনীগুলো কতটুকু প্রস্তুত? দীর্ঘ সময় ধরে দলীয়করণের অভিযোগে বিদ্ধ পুলিশ বাহিনীর মনোবল বর্তমানে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে আমূল সংস্কার ছাড়া সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। পেশাদারিত্বের অভাব এবং সাধারণ মানুষের সাথে আস্থার সংকট কাটাতে নতুন সরকার কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারে। 

রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, বরং ট্র্যাক রেকর্ড দেখে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব প্রদান। সাইবার অপরাধ ও হাই-টেক সন্ত্রাস দমনে বাহিনীকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং আধুনিক সার্ভেইল্যান্স প্রযুক্তিতে সজ্জিত করা। সন্ত্রাস দমনের নামে যেন ‘বিচারবহির্ভূত’ বা ‘নির্বিচার’ হয়রানি না হয়, তা নিশ্চিত করাও বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল একটি প্রশাসনিক কাজ নয়, এটি তাদের রাজনৈতিক বৈধতা ও জনপ্রিয়তার মাপকাঠি। মানুষ মনে করে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হলেও যদি জানমালের নিরাপত্তা না থাকে, তবে সব অর্জনই ম্লান হয়ে যায়।

১৭ বছরের পুরনো প্রশাসনিক কাঠামোতে যারা সুবিধাভোগী ছিলেন, তাদের বড় একটি অংশ শান্ত পরিবেশ বিঘ্নিত করার চেষ্টা করতে পারে। দলের ভেতরের অতিউৎসাহী কিছু নেতাকর্মী যদি দখলদারিত্বে জড়িয়ে পড়ে, তবে সরকারের ভাবমূর্তি চরম সংকটে পড়বে। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর মাথাচাড়া দেওয়ার শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কেবল কঠোর হলেই চলবে না, তাদের কৌশলী হতে হবে। সন্ত্রাস নির্মূলে একটি টেকসই মডেলের প্রয়োজন। 

স্থানীয় জনগণের সাথে পুলিশের সমন্বয় বাড়ানো। প্রতিটি পাড়া ও মহল্লায় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলে সন্ত্রাসীরা মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ পায় না।

এ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের পর যদি তারা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়, তবে বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে। তাই প্রসিকিউশন বিভাগকে শক্তিশালী করা জরুরি।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে হাইওয়ে এবং পাইকারি বাজারের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। এটি সফল হলে সাধারণ মানুষ সরাসরি সরকারের সুফল পাবে।

বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা খুব সামান্য তারা চায় শান্তিতে ঘুমাতে এবং নিরাপদে কাজ করতে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি তখনই সার্থক হবে যখন ঠাকুরগাঁও থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিক নিজেকে নিরাপদ বোধ করবে। সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ কেবল গুটিকয়েক সন্ত্রাসীকে ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রক্রিয়া।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি নিরপেক্ষভাবে তাদের ওপর অর্পিত পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে পারে, তবেই নতুন সরকারের এই ‘বিপ্লব’ সফল হবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের জন্য এটিই হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দিকনির্দেশনা একটি ভালো সূচনা হতে পারে, তবে মাঠ পর্যায়ে এর প্রতিফলন দেখার জন্য জনগণ মুখিয়ে আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি নিজেকে রাজনৈতিক কলুষমুক্ত করে রাষ্ট্রের প্রকৃত সেবক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, তবেই সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। আগামীর বাংলাদেশ হবে ভীতিহীন ও নিরাপদ এটাই হোক ২০২৬ সালের নবযাত্রার মূলমন্ত্র।

এএন