জুলাই আন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতি: বিচারহীনতার শঙ্কায় শোকাহত পরিবারগুলো

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: অক্টোবর ২, ২০২৫, ১২:৩১ পিএম
জুলাই আন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতি: বিচারহীনতার শঙ্কায় শোকাহত পরিবারগুলো

২০২৪ সালের জুলাই মাসের শুরু থেকে সেই বছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশজুড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্রমেই তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। শুরুতে শিক্ষার্থীরা ন্যায়সঙ্গত দাবির পক্ষে সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলন চালিয়ে যান, যা পুরো দেশজুড়ে ব্যাপক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

প্রথমদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন সাধারণ ছাত্র-জনতার ন্যায্য দাবি হিসেবে শুরু হলেও, তা পরবর্তীতে আন্দোলনের পরিধি দ্রুত রাজনৈতিক মোড় নেয় এবং শেষ পর্যন্ত এসে তা রূপ নেয় এক দফা দাবিতে। যা তৎকালীন সরকারের পতনের দাবি ছিল। সেই দাবির মুখেই ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। 

তবে এই আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায় ছিল পুলিশ ও সিভিল পোশাকধারী সন্ত্রাসীদের যৌথ হামলা, যেখানে দিনের আলোয় ছাত্রদের বুকে গুলি চালানো হয়।

পুলিশের সাথেই সরাসরি গোলাগুলি চালায় সন্ত্রাসীরা

সাক্ষী ও স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রমতে, জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের পাশাপাশি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরাও আন্দোলনকারীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। তাদের হাতে পিস্তল, রাইফেল, শর্টগান ও দেশি বন্দুক দেখা গেছে। 

অভিযোগ রয়েছে, এরা মূলত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন—যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্থানীয় রাজনৈতিক সহযোগী সংগঠনের কর্মী। ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা বলছে, পুলিশের ছত্রছায়ায় এই গুলিবর্ষণ সংঘটিত হয়েছিল।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্রনেতা জানান, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করছিলাম। হঠাৎ দেখি পুলিশের পেছন থেকে সাদা পোশাকের কয়েকজন অস্ত্র বের করে আমাদের দিকে গুলি ছুড়ছে। পুলিশের সঙ্গে তাদের কোনো বিরোধ ছিল না বরং তারা একে অপরকে সহায়তা করছিল।”

সন্তানহারা বাবা-মায়ের বেদনা

গুলিতে প্রাণ হারানো শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলো এখনো শোকে ভেঙে পড়ে আছে। 

একজন মা যার একমাত্র সন্তান নিহত হয়েছে চোখের জল ফেলে তিনি বলেন, “আমার ছেলেকে দিনের আলোতে গুলি করে হত্যা করা হলো। আজ এত মাস পরও আমি জানি না কে গুলি করেছিল। সরকার কি আমাদের সন্তানের হত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করবে?”

অন্য এক বাবা কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে বলেন, “আমার সন্তানকে আমি আর ফিরে পাব না। কিন্তু ন্যায়বিচার না পেলে এ শোক আরও বড় হবে। যদি প্রকৃত আসামিরা ধরা না পড়ে, তাহলে আমাদের কি আর কোনো আশা থাকে?”

আসামিরা কি ধরাছোঁয়ার বাইরে?

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুলাই আন্দোলনের সময়কার গুলি চালানোদের অনেকেই এখনও আইনের আওতায় আসেনি। প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের বেশিরভাগই জামিনে বেরিয়ে গেছে বা গায়েব হয়ে গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

একটি মানবাধিকার সংগঠনের কর্মকর্তা বলেন, “যে ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়েছিল, সেখানে স্পষ্ট দেখা গেছে কারা গুলি চালিয়েছে। অথচ কয়েক মাস পরও তাদের কেউই বিচারের মুখোমুখি হয়নি। এটা প্রমাণ করে রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় তারা রক্ষা পাচ্ছে।”

বিচারহীনতার সংস্কৃতি

বাংলাদেশে অতীতেও বহু রাজনৈতিক আন্দোলন রক্তাক্ত হয়েছে। তবে সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার খুব কম ক্ষেত্রেই হয়েছে। ১৯৭১-এর পর থেকে ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ২০০৬-০৭-এর রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা সাম্প্রতিক কোটা আন্দোলন। প্রত্যেক সময়ই দেখা গেছে প্রকৃত আসামিদের বিচার এড়িয়ে যাওয়া।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারহীনতার এ সংস্কৃতি চলতে থাকলে নতুন করে আরেকটি ভয়ঙ্কর অধ্যায় তৈরি হতে পারে। 

তারা মনে করেন, “যদি জুলাই আন্দোলনের খুনিদের বিচার না হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক শক্তির ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসীরা একই কাজ করার সাহস পাবে।”

সরকারের দায়বদ্ধতা

বর্তমান সরকার আন্দোলন পরবর্তী সময়ে অনেকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, জুলাই আন্দোলনে যারা গুলি চালিয়েছে তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনা হবে।

কিন্তু আহত-নিহত পরিবারগুলো অভিযোগ করছে, শুধু প্রতিশ্রুতি শুনলেও বাস্তবে তারা কোনো অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছেন না।

একজন নিহত শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, “প্রতিদিন আদালত আর প্রশাসনের দোরগোড়ায় ঘুরছি। কিন্তু শুনছি কেবল কাগজপত্র চলছে। আমরা তো কাগজ চাই না, আমরা বিচার চাই।”

আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, বাংলাদেশে যদি আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো খুনিদের বিচার না হয়, তবে এটি মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল হবে। আন্তর্জাতিক আদালত বা জাতিসংঘ পর্যন্ত এই ইস্যু তোলা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিচ্ছে কিছু সংস্থা।

জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় রচনা করেছে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি সরকার পতন ঘটলেও, একই সঙ্গে বহু তরুণের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, সেই রক্তের দাগ কি কেবল ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে, নাকি প্রকৃত আসামিদের বিচারের মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে?

সন্তানহারা বাবা-মায়ের আহ্বান একটাই—“আমাদের সন্তানকে ফিরিয়ে দাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি শেষ হোক। আমরা ন্যায় চাই, বিচার চাই।”

এইচআর/ইএইচ