ব্যাংক লুটেরাদের অর্থ ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার

রুহেল হাশেমী প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০২৫, ০৪:১৯ পিএম
ব্যাংক লুটেরাদের অর্থ ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার
  • কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে
  • হাজার কোটি টাকা ফেরত আনার উদ্যোগ

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতি, ভুয়া ঋণ ও অর্থ পাচার এখন জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এমন অভিযোগ রয়েছে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং শিল্পপতিদের বিরুদ্ধে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই আর্থিক অনিয়মের লাগাম টানতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকার ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্যোগ শুরু করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মুনসুর বলেছেন, “আমরা দেশ ও বিদেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক লুটের মাধ্যমে টাকা পাচার করেছে, তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে ধাপে ধাপে। আমাদের লক্ষ্য এক টাকাও যেন বিদেশে নিরাপদে না থাকে।”

তিনি জানান, ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তথ্য আদানপ্রদান শুরু করেছে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই, যুক্তরাজ্য ও কানাডার ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোতে সন্দেহজনক অর্থ প্রবাহের ব্যাপারে যোগাযোগ চলছে।

তদন্তে দেখা যাচ্ছে, গত এক দশকে একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রভাবশালী শিল্পপতি ও রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ব্যক্তিরা ভুয়া কাগজ, অতিমূল্যায়িত সম্পদ এবং কাল্পনিক কোম্পানি দেখিয়ে হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন। পরে সেই ঋণের বড় অংশই আর ফেরত দেওয়া হয়নি বরং বিভিন্ন অফশোর অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়েছে।

একাধিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত তালিকায় রয়েছেন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, “ব্যাংক খাতকে রক্ষা করা এখন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। যারা জনগণের টাকায় হাত দিয়েছে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। দেশ থেকে পাচার হওয়া প্রতিটি টাকার হিসাব আমরা খুঁজে বের করব।”

তিনি জানান, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও অর্থনৈতিক গোয়েন্দা ইউনিট যৌথভাবে একটি উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করেছে। এ টাস্কফোর্সের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, পাচার হওয়া অর্থের সন্ধান, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তা দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের আর্থিক অপরাধ বন্ধ করা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের শেকড় রয়েছে তৎকালীন সরকারের সময় থেকে। সে সময় রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে লোন নেওয়া ছিল এক ধরনের ক্ষমতার প্রতীক।

তৎকালীন সরকারের মদদে ব্যাংক বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল, যার সুযোগ নিয়ে তারা নিজেদের স্বার্থে রাজনৈতিক অনুগত ব্যবসায়ীদের হাজার কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দেন।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, “যখন ব্যাংকিং সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক হয়ে যায়, তখন আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন সেই পুরোনো ভুলের মূল্য দিচ্ছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ইন্টারপোল, এশিয়ান ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এবং যুক্তরাজ্য ও কানাডার আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমঝোতা করেছে। উদ্দেশ্য একটাই যেসব ব্যক্তি বিদেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে অবৈধভাবে টাকা স্থানান্তর করেছেন, তাদের সম্পদ চিহ্নিত করে ফিরিয়ে আনা।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মুনসুর বলেন, “অর্থ ফেরত আনা কোনো একদিনের কাজ নয়। এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তবে ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশে আমাদের অনুরোধ পাঠানো হয়েছে এবং প্রাথমিক সাড়া পাওয়া গেছে।”

সরকার চাইছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন আরও শক্তিশালী করা হোক, যাতে বিদেশে সম্পদ লুকানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা করা যায় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো যায়।

কিছু ব্যাংক তাদের পেইড-আপ ক্যাপিটাল ও রিজার্ভের চেয়ে বেশি পরিমাণ খারাপ ঋণের বোঝা বহন করছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ না হলে, ব্যাংকিং খাত পুরো অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির জন্য পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে— ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক নিয়োগ বন্ধ, ভুয়া কোম্পানি বা প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর অস্বচ্ছ ঋণ আবেদন বাতিল, প্রতিটি বড় ঋণ অনুমোদনের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) নিয়োগে ফিট অ্যান্ড প্রপার টেস্ট কঠোরভাবে প্রয়োগ, বিদেশে টাকা পাচারের অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া শুরু।

অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর জন্য তারা সুইজারল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও কানাডায় গঠিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মডেল অনুসরণ করছে। এই মডেলে স্থানীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাচারের প্রমাণ দিলে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ফরেন অ্যাসেট রিকভারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টাকা ফেরত দিতে বাধ্য।

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমরা চাই না এই অভিযান রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হোক। লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের টাকা জনগণের কাছে ফিরিয়ে আনা। কেউ অপরাধী হলে তার দলীয় পরিচয় নয়, তার কাজই হবে বিচার্য।”

সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন একটাই প্রত্যাশা সরকার যেন ব্যাংক লুটেরাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়। মালিকানাভিত্তিক ব্যাংক সংস্কৃতির পরিবর্তে, জনগণনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনা চায় সবাই।

রাজধানীর মিরপুরের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমার সংবাদকে বলেন, “আমরা ছোট লোন নিতে গেলে মাসের পর মাস দৌড়াতে হয়, অথচ বড়লোকেরা ভুয়া কাগজে হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে চলে যায়। এবার সরকার যদি সত্যিই ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বিশ্বাস ফিরে আসবে।”

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের মূল চাবিকাঠি হলো ব্যাংক খাতের সংস্কার।

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক এবং গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারকে এখনই ‘ক্লিন-আপ অপারেশন’ শুরু করতে হবে, যাতে জনগণের আস্থা ফিরে আসে।”

অন্তর্বর্তী সরকার এখন এক কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় পথে হাঁটছে। যেখানে অর্থনৈতিক সুশাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতি দমন হবে সরকারের নীতি-অঙ্গীকারের কেন্দ্রে। দেশে ও বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অবৈধ অর্থ ফেরত আনার এই প্রচেষ্টা সফল হলে, এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতির জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

আরএইচ/ইএইচ