টেকসই কৃষি অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠনের প্রস্তাব

অর্থনেতিক প্রতিবেদক প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২৫, ০৬:৩১ পিএম
তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠনের প্রস্তাব
  • স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে যুব কৃষি খাতে ভূমিকা রাখা সম্ভব
  • জাতীয় আয়ের প্রায় ১২% আসে কৃষি থেকে
  • ৪০% মানুষ কৃষিখাতে নির্ভরশীল

বাংলাদেশে তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা, নারী, কৃষক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারীদের সহায়তায় একটি সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করতে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলকে (আইএফএডি) অনুরোধ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

রোববার রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামের সাইডলাইনে আইএফএডি প্রেসিডেন্ট আলভারো লারিওর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় প্রধান উপদেষ্টা এ প্রস্তাব দেন।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আপনাদের আহ্বান জানাই-একটি সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করুন। এ তহবিল দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা এবং তরুণ, কৃষক, নারী ও মৎস্যজীবীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আহ্বান জানিয়েছেন, বাংলাদেশের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করা হোক। এই আহ্বান কেবল একটি নীতিগত প্রস্তাব নয় বরং এটি বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিকে টেকসই উন্নয়নের নতুন ধারায় ফিরিয়ে আনার এক মানবিক উচ্চারণও বটে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই আহ্বান বাস্তবে কতটা কার্যকর হতে পারে? তরুণ প্রজন্মের কৃষি উদ্যোক্তারা কি সত্যিই এই তহবিল থেকে উপকৃত হবেন?

বাংলাদেশের কৃষি খাত আজও দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। জাতীয় আয়ের প্রায় ১২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে এবং দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এই খাতের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। তবু এই খাতেই বিনিয়োগ সবচেয়ে কম, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের জন্য।

বর্তমানে দেশে অসংখ্য তরুণ স্নাতক, ডিপ্লোমাধারী বা গ্রামীণ উদ্যোক্তা নতুন ধাঁচের কৃষিতে (হাইড্রোপনিক, অর্গানিক, মৎস্য, দুগ্ধ, ফুল ও ফল চাষ) কাজ করতে চাইলেও মূল সমস্যায় পড়েন পুঁজির অভাব ও বাজারে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতায়।

ব্যাংকগুলো এখনো কৃষিকে “ঝুঁকিপূর্ণ খাত” হিসেবে দেখে। ফলে ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে কৃষকের চেয়ে বাণিজ্যিক ব্যবসায়ীরা বেশি সুবিধা পান। এই বাস্তবতায় সামাজিক ব্যবসা তহবিলের প্রস্তাবটি তরুণ কৃষকদের কাছে এক নতুন আশার আলো।

ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসার দর্শন মূলত “মানবিক মুনাফা” কেন্দ্রিক। এখানে উদ্যোক্তা লাভ করেন না অর্থে, বরং সমাজের কল্যাণে সাফল্য অর্জনই তার লক্ষ্য। কৃষিখাতে এই ধারণা প্রয়োগ করলে গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল করার বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়।

আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি) ও জাতিসংঘের আওতাধীন অন্যান্য সংস্থাগুলো এই তহবিল গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশের যুব উদ্যোক্তাদের হাতে একটি নিরাপদ, নৈতিক ও স্বচ্ছ বিনিয়োগের সুযোগ দিতে পারে। বিশেষ করে “সামাজিক ব্যবসা মডেল” যদি সরকারি কৃষি ঋণ প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বিত হয়, তবে এটি বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

তবে কেবল আহ্বান জানালেই হবে না। বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত ও সরকারি নীতি কাঠামোতে সামাজিক ব্যবসার জন্য আলাদা কোনো আর্থিক কাঠামো নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ নীতিমালায় প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এর মাত্র ৫–৬ শতাংশ যায় তরুণ বা নতুন উদ্যোক্তাদের হাতে।

এখানেই বড় সমস্যা ব্যাংকগুলোর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জমির দলিল বা গ্যারান্টির অভাব এবং প্রকল্প মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা। ফলে অনেক যোগ্য তরুণ উদ্যোক্তা প্রাথমিক পর্যায়েই বাদ পড়ে যান।

বর্তমানে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও খাদ্য প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি গ্রহণ করেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই চাকরির জন্য শহরমুখী হচ্ছেন। কারণ গ্রামে উদ্যোক্তা হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ কম, ঝুঁকি বেশি, সহযোগিতা প্রায় শূন্য।

একটি কার্যকর সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠিত হলে, এই শিক্ষিত তরুণেরা গ্রামে থেকেই ব্যবসা দাঁড় করাতে পারবেন। তারা কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে পারবেন ড্রোন স্প্রে, মাটির পিএইচ বিশ্লেষণ, জিপিএস কৃষি মানচিত্র, ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস ইত্যাদি মাধ্যমে।

এই পরিবর্তন শুধু কৃষকের জীবনই বদলাবে না, বদলে দেবে গ্রামের অর্থনীতির গতিপথও।

আইএফএডি, এফএও বা ইউএনডিপির মতো সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে টেকসই কৃষি উন্নয়নে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে সেগুলো বেশিরভাগই দাতা নির্ভর ও সময়সীমাবদ্ধ। সামাজিক ব্যবসা তহবিল হলে এটি “চ্যারিটি” নয়, বরং একটি পুনঃবিনিয়োগযোগ্য ব্যবস্থা, যেখানে টাকা ঘুরে ফিরে নতুন উদ্যোক্তার হাতে পৌঁছাবে।

এই মডেলটি সফলভাবে প্রয়োগ করা গেছে রুয়ান্ডা, নেপাল ও ভিয়েতনামে। সেখানে কৃষকরা একদিকে বাজারে প্রতিযোগিতামূলকভাবে টিকে আছেন, অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তারা লাভের বাইরে সমাজসেবায় অবদান রাখছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনিসুজ্জামান মনে করেন, “বাংলাদেশের তরুণ কৃষকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের অভাব। সামাজিক ব্যবসা তহবিল যদি স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়, তবে এটি যুব কৃষিতে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে।”

অন্যদিকে কৃষি অর্থনীতিবিদ শফিউল বারী বলেন, “তহবিল গঠনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এর বাস্তবায়ন কাঠামো। যাতে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি বা আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব না ঘটে।

অন্তর্বর্তী সরকারের বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হলো স্থিতিশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধি। কৃষিকে কেন্দ্র করে সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করলে সরকারের ওপর সরাসরি চাপ কমবে কারণ এটি হবে স্বনির্ভর ও বিনিয়োগঘূর্ণনমুখী একটি তহবিল।

তবে এর জন্য দরকার হবে, একটি যুব কৃষি উদ্যোক্তা নীতি, সামাজিক ব্যবসার জন্য কর ছাড় ও নিবন্ধন সুবিধা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব মডেল এবং পর্যবেক্ষণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বতন্ত্র বোর্ড।

ড. ইউনূসের এই আহ্বান নিছক একটি বক্তব্য নয়, এটি এক ধরণের ভবিষ্যৎ নির্দেশনা। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি যদি সত্যিই টেকসই ও যুবনির্ভর হতে চায়, তবে এই সামাজিক ব্যবসা তহবিলের মতো উদ্যোগগুলোকে শুধু আন্তর্জাতিক মঞ্চে নয়, দেশের মাঠে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।

তরুণ কৃষকদের শক্তি, উদ্ভাবন ও বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠতে পারে এক নতুন বাংলাদেশ। যেখানে কৃষি হবে মর্যাদার পেশা, উদ্যোক্তা হবে পরিবর্তনের কারিগর, আর উন্নয়ন হবে মানবিকতার পথে।

ইএইচ