আন্তর্জাতিক মানে রুপান্তরের পথে চট্টগ্রাম বন্দর

আজিজুল হক আজিজ, চট্টগ্রাম প্রকাশিত: অক্টোবর ২৬, ২০২৫, ০৬:৫২ পিএম
আন্তর্জাতিক মানে রুপান্তরের পথে চট্টগ্রাম বন্দর
  • বে–টার্মিনাল প্রকল্পের প্রথম ধাপ ২০২৬ সালের মধ্যে শেষ হবে
  • প্রত্যক্ষভাবে ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে
  • পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গ্রিন পোর্ট নীতি অনুসরণের আহ্বান

বাংলাদেশকে আঞ্চলিক উৎপাদন ও লজিস্টিকস হাবে রূপান্তরের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ছয়গুণ বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, বরং পূর্ব–দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রধান লজিস্টিকস হাবে পরিণত হবে বলে আশা করছেন নীতিনির্ধারকরা।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সম্প্রতি চট্টগ্রামের এক সভায় বলেন, ‘অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে একটি ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে পরিণত করা। সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রথম শর্ত হলো চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি। ২০৩০ সালের মধ্যে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ছয়গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৩২ লাখ টিইইউ। ২০২৪ সালে এই বন্দরের মাধ্যমে দেশের ৯২ শতাংশ আমদানি–রপ্তানি পণ্য পরিবহন হয়। 

সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রায় ১৮–২০ লাখ টিইইউ থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ টিইইউ পর্যন্ত উন্নীত করার রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে।

প্রেস সচিব জানান, ‘বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো মানে শুধু যন্ত্রপাতি বা ক্রেন বাড়ানো নয়। এর অর্থ হচ্ছে, সার্বিক লজিস্টিকস চেইন, সড়ক, রেল, কাস্টমস, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, সব কিছুর সমন্বিত উন্নয়ন।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্প ও রপ্তানি-নির্ভর প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে হলে বন্দর ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো অপরিহার্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতিদিনের গড় পণ্য জট ২০২৩ সালে দাঁড়িয়েছিল ৯ থেকে ১১ দিন, যেখানে প্রতিবেশী কলম্বো বন্দরে গড় সময় মাত্র ৩ দিন।

বন্দর বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমরা যত দ্রুত পণ্য খালাস করতে পারব, বিদেশি বিনিয়োগ তত বাড়বে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, এটি ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের জন্যও প্রাকৃতিক গেটওয়ে। যদি চট্টগ্রাম আধুনিক হয়, পুরো অঞ্চলের বাণিজ্যই বদলে যাবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিমালায় বলা হয়েছে, রিজিওনাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব বলতে শুধু রপ্তানি পণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, বরং পুরো উৎপাদন–সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্র বোঝানো হয়েছে, যেখানে কাঁচামাল আসবে, প্রক্রিয়াজাত হবে, আবার রপ্তানিও যাবে।

এই লক্ষ্যে পরিকল্পিত কয়েকটি বড় প্রকল্প হলো, বে–টার্মিনাল প্রকল্প: তিন ধাপে বাস্তবায়নাধীন, সম্পন্ন হলে বন্দরের সক্ষমতা দ্বিগুণ হবে। পাতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল: আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন শেষ পর্যায়ে, বেসরকারি অংশীদারিত্বে পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর: ২০২৬ সালের মধ্যে চালু হলে বৃহৎ জাহাজ নোঙর দিতে পারবে, যা দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াবে। রেল সংযোগ উন্নয়ন: চট্টগ্রাম–ঢাকা ডাবল লাইন প্রকল্প, যা পণ্য পরিবহনের সময় অর্ধেকে নামিয়ে আনবে।

প্রেস সচিব আরও জানান, ‘বন্দর উন্নয়নের জন্য মোট প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার একটি বড় অংশ আসবে সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।’

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা যদি দ্বিগুণ হয়, তাহলে দেশের রপ্তানি আয় অন্তত ২৫ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। কারণ দ্রুত খালাস মানে দ্রুত চালান, অর্থাৎ মূলধন আটকে থাকার সময় কমে যাবে।”

তবে শুধু বন্দরের ভেতরে আধুনিকতা আনলেই হবে না, বলেন সংশ্লিষ্টরা। বন্দরের বাইরে সড়ক ও সংযোগ অবকাঠামোই বড় প্রতিবন্ধকতা।

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা পর্যন্ত ২৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কপথে প্রতিদিন গড়ে ৬০০০–৭০০০ ট্রাক চলাচল করে। যানজট, টোল প্লাজা বিলম্ব ও রাস্তার সীমিত সক্ষমতার কারণে বন্দরের খালাস বিলম্ব প্রায় দ্বিগুণ হয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বন্দরের গেট থেকে পণ্য বের হতে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে, কিন্তু ঢাকায় পৌঁছাতে লাগে গড়ে ৪৮ ঘণ্টা। এই অদক্ষতা রপ্তানি ব্যয় ১১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায়।

সরকার এখন ঢাকা–চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ের পাশাপাশি চট্টগ্রাম–কক্সবাজার–মাতারবাড়ি মাল্টিমোডাল করিডোর নির্মাণের পরিকল্পনাও নিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বন্দরের পুরো কার্যক্রমে ডিজিটাল ট্র্যাকিং, অনলাইন ডকুমেন্টেশন ও অটোমেশন চালু করা হবে।

শফিকুল আলম আরও বলেন, ‘আমরা চাই বন্দর এমনভাবে পরিচালিত হোক যেন পণ্য জাহাজ থেকে নামা থেকে শুরু করে কাস্টমস ছাড় পর্যন্ত সব প্রক্রিয়া ডিজিটাল হয়। এতে সময় অর্ধেকে কমবে।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেমের ট্রায়াল শুরু করেছে, যেখানে আমদানি–রপ্তানিকারক, কাস্টমস, শিপিং এজেন্ট ও ব্যাংক একত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করবে। 

বন্দর সম্প্রসারণের ফলে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে, এবং পরোক্ষভাবে আরেক দেড় লাখ মানুষ নতুন শিল্প–সেবা খাতে যুক্ত হতে পারবেন।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৫,০০০ ছোট–বড় রপ্তানি প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের কার্যক্রম এই সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

চট্টগ্রাম বন্দরের সাম্প্রতিক উন্নয়ন শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং নেতৃত্ব ও দৃঢ় পরিকল্পনার প্রতিফলন। বর্তমান চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস.এম. মনিরুজ্জামান দায়িত্ব গ্রহণের পর বন্দরকে কেবল দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে নয়, বরং দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহিতা ও আন্তর্জাতিক মানের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার নেতৃত্বে বন্দরের প্রতিটি বিভাগ নতুন চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করছে এবং বন্দরকে বিশ্ব দরবারে প্রতিযোগিতার যোগ্য করে তুলছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সচিব মো. ওমর ফারুক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বন্দরের 'সম্মুখ যোদ্ধা' হিসেবে দিন-রাত পরিশ্রম করে আসছেন। তার অভিজ্ঞতা ও নিখুঁত প্রক্রিয়াজ্ঞান বন্দর ব্যবস্থাপনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

এই দুই কর্মকর্তা মিলে বন্দরকে একটি চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু ফলপ্রসূ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। কেবল অবকাঠামো বা যন্ত্রপাতির আধুনিকীকরণ নয়, বরং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপন হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বন্দরের দক্ষতা বাড়লে বাংলাদেশের লজিস্টিকস খরচ জিডিপির ১৫ শতাংশ থেকে কমে ৯ শতাংশে নামানো সম্ভব, যা আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি।

অবশ্য উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রাম উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বন্দরের সম্প্রসারণে গ্রিন পোর্ট নীতি অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশবিদেরা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক বলেন, ‘নতুন বন্দর–টার্মিনাল নির্মাণের সময় সাগরের জোয়ার–ভাটার প্রাকৃতিক প্রবাহ যেন ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে বন্দরের সাফল্য পরিবেশের ক্ষতির কারণ হতে পারে।’

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বে–টার্মিনাল প্রকল্পের প্রথম ধাপ ২০২৬ সালের মধ্যে শেষ হবে। একই সঙ্গে পাতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ২০২৫ সালেই আংশিকভাবে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পণ্যবাহী জাহাজ গ্রহণ শুরু করবে।

যৌথভাবে এসব প্রকল্প সম্পন্ন হলে ২০৩০ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত বন্দর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

বন্দর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দক্ষতা বৃদ্ধি শুধুমাত্র অবকাঠামোর নয়, বরং ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনেরও বিষয়। 

তাদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের পরিচালনা কাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যদি ২০৩০ সালের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ হয়, বাংলাদেশ কেবল পোশাক নয়, ইলেকট্রনিক্স, হালকা যন্ত্রাংশ ও ওষুধ রপ্তানিতেও আঞ্চলিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দর কেবল একটি বন্দর নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির ফুসফুস। এই ফুসফুস যত শক্তিশালী হবে, দেশের শিল্প ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

অন্তর্বর্তী সরকারের ছয়গুণ সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য যদি সময়মতো বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ সত্যিই পৌঁছে যেতে পারে তার সেই ঘোষিত লক্ষ্য 'রিজিওনাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাবের পথে।

ইএইচ