১ বছরে প্রাণ গেছে ৭৩৫৯ জনের

বাংলা টেসলার দৌরাত্ম্যে নাজেহাল ঢাকাবাসী

শাহিনুর রহমান, ঢাকা প্রকাশিত: জানুয়ারি ১১, ২০২৬, ০২:২১ পিএম
বাংলা টেসলার দৌরাত্ম্যে নাজেহাল ঢাকাবাসী

ঢাকায় দিন দিন বেড়ে চলেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্য। কম পরিশ্রমে বেশি আয়ের লোভে চালকরা যেমন এই যান বেছে নিচ্ছেন, তেমনি বাড়ছে নগরবাসীর দুর্ভোগ। দুর্ঘটনা, যানজট ও সড়কে বিশৃঙ্খলায় পরিস্থিতি এখন কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে এমনটাই জানাচ্ছে পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগ।

প্রচণ্ড ব্যস্ত রাজধানীর সড়কগুলোতে প্রতিদিনই অসংখ্য ব্যাটারি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছুটে চলছে। যাত্রী তুলতে কিংবা মোড় ঘোরাতে চালকরা মানছেন না কোনো ট্রাফিক নিয়ম। এর ফলেই বাড়ছে দুর্ঘটনা ও যানজট, নাজেহাল হচ্ছেন অন্যান্য যানচালক ও পথচারীরা। 

একসময় রিকশা চালানো মানেই ছিল ঘামঝরা পরিশ্রম। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নয়নে সেই জায়গা দখল করেছে ব্যাটারি ও মোটরচালিত অটোরিকশা। শহরের অলিগলি থেকে মহাসড়ক সবখানেই এখন ছুটে চলছে ‘বাংলার টেসলা’ খ্যাত এই যান, যা ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার বেগে চলতে পারে।

শারীরিক পরিশ্রম কমলেও বেড়েছে সড়কে তাদের দৌরাত্ম্য। হুটহাট বামে-ডানে মোড় নেওয়া, যাত্রী দেখলেই ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে যাওয়া এসব আচরণে নাজেহাল হচ্ছেন অন্যান্য যানচালক ও যাত্রীরা। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই রাস্তায় নামছে এসব অটোরিকশা। অনেক গাড়িতেই নেই শক্ত ব্রেক ব্যবস্থা ও মানসম্মত সাসপেনশন। ফলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। প্রতিটি গাড়িতে দৈনিক গড়ে ৪০০ টাকা জমা ধরলে, বছরে এই খাতে লেনদেন দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা যা একটি বিশাল অনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে।

সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে কাজ করা সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৫৯ জন এবং আহত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার মানুষ। এদের মধ্যে মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। 

একই বছরে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাড়ে ৭ হাজার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ নিহত হয়েছেন ৫ হাজার ৭২৩ জন, যা মোট নিহতের প্রায় ৭৮ শতাংশ।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে চাহিদার তুলনায় গণপরিবহনের স্বল্পতা রয়েছে। আবার যেসব গণপরিবহন আছে, সেগুলোর বড় অংশই জরাজীর্ণ। এই সুযোগেই কারিগরিভাবে ত্রুটিপূর্ণ তিন চাকার ব্যাটারি ও ইঞ্জিনচালিত রিকশা ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব যান নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি। 

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, মূল সমস্যার মূলে রয়েছে গণপরিবহনের সংকট ও নীতিগত দুর্বলতা। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া কোনো যান চালু হওয়ায় পরে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অল্প পরিশ্রমে আয় ও দ্রুত চলাচলের সুযোগ থাকলেও, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন নগরবাসীর জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন দিন বাড়তে থাকা যানজট ও দুর্ঘটনা রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে করছে আরও ঝুঁকিপূর্ণ যা সবার জন্যই এক বড় আশঙ্কা।

শাহিনুর/ইএইচ