‘অন্ধের দেশ’: মুহাম্মদ ইউনূসকে কীভাবে মনে রাখবে বাংলাদেশ?

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ০১:৩৩ পিএম
‘অন্ধের দেশ’: মুহাম্মদ ইউনূসকে কীভাবে মনে রাখবে বাংলাদেশ?

ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় যখন ৫০ বছর বয়সী রুবেল চাকলাদার তার অটোরিকশা চালাচ্ছিলেন, তার কণ্ঠে রাগের চেয়ে বেশি ছিল এক গভীর হাহাকার। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে যে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তাকে তিনি দেখেছিলেন একটি বিরল সুযোগ হিসেবে। কিন্তু ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে এসে তার মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ সেই সুযোগটি হারিয়েছে।

রুবেল আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘আমরা সুযোগটা নষ্ট করেছি। আমরা ড. ইউনূসকে ঠিকমতো কাজ করতে দিইনি। এই দেশ আর কোনোদিন ভালো হবে না। জুলাই মাসে যারা প্রাণ দিয়েছিল, সব বৃথা গেল।

রুবেলের এই ক্লান্তিবোধ কেবল তার একার নয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আর এই প্রস্থানলগ্নে দাঁড়িয়ে পুরো বাংলাদেশে একটিই প্রশ্ন—মুহাম্মদ ইউনূসকে ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে? তিনি কি একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে টেনে তোলা ত্রাণকর্তা, নাকি কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হওয়া এক নেতা?

২০২৪ সালের আগস্টে যখন হাসিনা সরকারের পতন ঘটে, তখন বাংলাদেশ এক চরম নৈরাজ্যের মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। ১,৪০০ মানুষের রক্তে ভেজা সেই রাজপথ থেকে নতুন দিগন্তের স্বপ্ন দেখছিল শিক্ষার্থীরা। সেই ক্রান্তিলগ্নে ড. ইউনূসের চেয়ে গ্রহণযোগ্য আর কোনো নাম ছিল না।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (NCP) নেতা এবং আন্দোলনের অন্যতম মুখ নাহিদ ইসলাম আল জাজিরাকে বলেন, ‘সেই মুহূর্তে আমাদের এমন একজনকে দরকার ছিল যিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। ইউনূস ছাড়া আর কাউকে আমরা খুঁজে পাইনি।‘

আরেক ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানান, প্রাতিষ্ঠানিক ধস ঠেকাতে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে ইউনূসের ‘নৈতিক কর্তৃত্ব’ (Moral Authority) ছিল অপরিহার্য। যদিও ইউনূস শুরুতে নিজেকে ‘অরাজনৈতিক ব্যক্তি’ বলে এই গুরুদায়িত্ব গ্রহণে ইতস্তত করেছিলেন, কিন্তু রক্তের স্রোত ও তরুণদের দাবির মুখে তিনি একে ‘নৈতিক বাধ্যবাধকতা’ হিসেবে গ্রহণ করেন।

ইউনূস সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল হাসিনার আমলের অপরাধগুলোর বিচার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কার। নির্বাচিত সংসদ ছাড়াই ইউনূস প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একাধিক কমিশন গঠন করে। এর মধ্যে ছিল:

 * নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন
 * সংবিধান সংস্কার কমিশন
 * বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন
 * পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী সংস্কার প্রচেষ্টা। সমর্থকরা একে ‘সত্য প্রকাশ’ হিসেবে দেখলেও সমালোচকদের মতে, একটি অনির্বাচিত সরকার একসাথে অনেক বেশি কিছু করার চেষ্টা করেছে।

ইউনূস প্রশাসনের সবচেয়ে স্মরণীয় সাফল্য হিসেবে ধরা হচ্ছে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো তদন্ত করতে তিনি একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করেন। এই কমিশন ১,৯১৩টি অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে এবং ২৮৭ জন ভুক্তভোগীকে মৃত বা নিখোঁজ হিসেবে শনাক্ত করেছে।

অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্কট ফেলো মুবাশার হাসান, যিনি নিজে ২০১৭ সালে অপহরণের শিকার হয়েছিলেন, তিনি ড. ইউনূসের এই উদ্যোগকে ‘সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হস্তক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেন। ইউনূস নিজে গোপন ডিটেইনশন সেন্টার বা ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শন করেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বাধা সত্ত্বেও সত্য প্রকাশের সাহস দেখান।

এছাড়া তার শাসনামলেই শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তার প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়কে যুক্ত করার মাধ্যমে ইউনূস তার বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন।

উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য থাকলেও ১৮ মাসের এই শাসনামল সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিল না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন, আমলাতন্ত্র সংস্কারে ইউনূস প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। তিনি বলেন, “জনগণ আশা করেছিল ইউনূস সেই জেঁকে বসা আমলাতন্ত্রকে উপড়ে ফেলবেন যা নাগরিকদের ওপর প্রভুত্ব করে। কিন্তু কাঠামোগত বাধা এবং অনির্বাচিত ম্যান্ডেটের সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি তা করতে পারেননি।

এছাড়া রাস্তাঘাটে প্রতিদিনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ দাবি নিয়ে চলা বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দ্রুত নির্বাচনের চাপ ইউনূসের সংস্কার কাজকে বারবার ব্যাহত করেছে। ড. ইউনূসের সমর্থক রুবেলের মতো মানুষেরা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো ইউনূসকে সময় দেওয়ার চেয়ে নিজেদের ক্ষমতার স্বাদ নিতে বেশি উদগ্রীব ছিল।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ইউনূস যখন বিদায় নেবেন, তখন তার উত্তরসূরিদের জন্য তিনি কী রেখে যাচ্ছেন?

একটি স্বচ্ছ নির্বাচনী কাঠামো: গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবার একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা তার অন্যতম বড় কৃতিত্ব।

আইনের শাসন: বিচার বিভাগকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া।

মানবিক মর্যাদা: গুম ও নির্যাতনের সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকার করে নিয়ে ভুক্তভোগীদের স্বীকৃতি দেওয়া।

তবে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার মতো অনেকের মনেই থেকে যাচ্ছে আফসোস। তিনি বলেন, আমরা একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার চেয়েছিলাম, যা সম্ভব হয়নি। আমরা চেয়েছিলাম রাষ্ট্রের আমূল সংস্কার।

মুহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্বকে আল জাজিরা আখ্যা দিয়েছে একটি ‘অস্বাভাবিক রাজনৈতিক উত্তরণ’ (Unusual Political Transition) হিসেবে। তিনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন যখন রাষ্ট্র মৃতপ্রায়। তিনি রাষ্ট্রকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দিয়েছেন এবং গত ১৬ বছরের বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন।

ইতিহাস তাকে কীভাবে মনে রাখবে, তার উত্তর হয়তো ১২ ফেব্রুয়ারির পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারের আচরণের ওপর নির্ভর করছে। যদি তার প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো টিকে থাকে, তবে ইউনূস হবেন আধুনিক বাংলাদেশের ‘স্থপতি’। আর যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আবারও ফিরে আসে, তবে ইউনূস হয়ে থাকবেন এক মহৎ কিন্তু অসমাপ্ত গল্পের ট্র্যাজিক হিরো।

অটোরিকশা চালক রুবেলের ভাষায়, ‘ড. ইউনূস আমাদের আয়না দেখিয়েছিলেন, কিন্তু আমরা সেই আয়নায় নিজেদের কুৎসিত মুখ দেখতে ভয় পেয়েছি।

তথ‍্যসূত্র: আল জাজিরা

এএন