বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ‘টাকা আয়ের হাতিয়ার’ বানানোর বিস্ফোরক অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম
বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ‘টাকা আয়ের হাতিয়ার’ বানানোর বিস্ফোরক অভিযোগ

বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বিচার প্রক্রিয়ার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখন এক নজিরবিহীন বিতর্কের মুখে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিদায়ের দিনে সহকর্মীদের কাছ থেকেই উঠে এসেছে দুর্নীতি, সিন্ডিকেট এবং ‘রাজসাক্ষী নাটকের’ মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের চাঞ্চল্যকর সব অভিযোগ। এই ঘটনা কেবল ট্রাইব্যুনালের ভেতরে অস্থিরতা সৃষ্টি করেনি, বরং সদ্য সমাপ্ত উচ্চ পর্যায়ের বিচারগুলোর স্বচ্ছতা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তুলেছে।

অভিযোগের সূত্রপাত: একটি ফেসবুক পোস্ট ও প্রসিকিউটরের জবানবন্দি

ঘটনার সূত্রপাত হয় সোমবার, যখন কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ট্রাইব্যুনালের ‘সেটলিং বাণিজ্য’ নিয়ে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেওয়া হয়। সেই পোস্টের নিচে মন্তব্য করে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটান খোদ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম মিলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। সুলতান মাহমুদের ভাষায়, "চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা আয়ের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছিল।"

ভারী ব্যাগের রহস্য ও আশুলিয়ার ‘লাশ পোড়ানো’ মামলা

প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদের আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো আশুলিয়ার আলোচিত লাশ পোড়ানো মামলার আসামি এসআই আবজালুল হককে নিয়ে। 

সুলতান মাহমুদ দাবি করেন-

  • গত বছরের নভেম্বরে তিনি নিজ চোখে দেখেছেন এসআই আবজালের স্ত্রী একটি ‘ভারী ব্যাগ’ নিয়ে প্রসিকিউটর তামীমের কক্ষে প্রবেশ করছেন।
  • বিষয়টি তিনি তাৎক্ষণিকভাবে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, উল্টো তাকে তিরস্কার করা হয়েছিল।
  • পরবর্তীকালে রহস্যজনকভাবে সেই এসআই আবজালকে ‘রাজসাক্ষী’ (অ্যাপ্রুভার) করা হয় এবং গত ৫ ফেব্রুয়ারির রায়ে তাকে সম্পূর্ণ খালাস দেওয়া হয়।

এই ঘটনাটি প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদের মতে একটি সুপরিকল্পিত ‘বাণিজ্যিক সমঝোতা’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

আইজিপি মামুন ও রাজসাক্ষী নাটক

অভিযোগের তীর কেবল এসআই আবজালের দিকেই নয়, বরং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনের দিকেও। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলায় যেখানে শেখ হাসিনাসহ অন্যদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছে, সেখানে আইজিপি মামুনকে কেন রাজসাক্ষী করে মাত্র পাঁচ বছরের সাজা দিয়ে রক্ষা করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুলতান মাহমুদ। তিনি অভিযোগ করেছেন, টাকার বিনিময়ে অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়ার একটি চক্র ট্রাইব্যুনালের ভেতরেই সক্রিয় ছিল।

এছাড়াও চানখাঁরপুলে গুলিবর্ষণের ভিডিও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি না করে সাক্ষী করা এবং রংপুরের আবু সাঈদ হত্যা মামলায় অভিযুক্ত এসি ইমরানকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়গুলোকেও তিনি ‘সন্দেহজনক’ বলে অভিহিত করেছেন।

তাজুল ইসলামের সাফাই: ‘ব্যক্তিগত আক্রোশ ও মিথ্যা’

গতকাল দুপুরে যখন তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিলের খবর আসে, তখন তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। দুর্নীতির এই অভিযোগগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তা অস্বীকার করেন। 

তাজুল ইসলামের দাবি-

  • এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে করা হয়েছে।
  • বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছ ছিল এবং আদালতের রায়ের মাধ্যমেই সবকিছু প্রমাণিত হয়েছে।
  • প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদের দাবি অনুযায়ী কোনো ‘ভারী ব্যাগ’ বা দুর্নীতির বিষয় তার জানা নেই এবং তদন্তে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

তার পাশে থাকা অভিযুক্ত অপর প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমও এই অভিযোগগুলোকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন।

নতুন চিফ প্রসিকিউটরের চ্যালেঞ্জ: প্রথম দিনেই অস্বস্তি

তাজুল ইসলামের বিদায়ের পর সরকার দ্রুততম সময়ে মো. আমিনুল ইসলামকে নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই তাকে এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নতুন চিফ প্রসিকিউটর আপাতত নিজেকে এই বিতর্ক থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আজ আমি এখানে মেহমান। অভিযোগগুলো যদি সত্য হয় তবে তা অবশ্যই আমার কাছে লিখিতভাবে আসবে এবং তখন আমরা তা খতিয়ে দেখব।‘

জনমনে প্রশ্ন ও আগামীর বিচার ব্যবস্থা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে যখন খোদ প্রসিকিউটররাই একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। 

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তবে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদের কাছে থাকা তথাকথিত ‘ভিডিও প্রমাণ’ এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো যদি প্রমাণিত হয়, তবে তা দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হবে। নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের সামনে এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ একদিকে ট্রাইব্যুনালের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ এই দুর্নীতির অভিযোগগুলোর একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা।

অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের এই দোলাচলে ট্রাইব্যুনাল এখন উত্তাল। তাজুল ইসলামের বিদায় কেবল একটি পদের পরিবর্তন নয়, বরং এটি অনেকগুলো অমীমাংসিত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যা আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতি ও বিচারিক অঙ্গনকে প্রভাবিত করবে।

এএন