মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের উইকেট চট দিয়ে ঢাকা। গ্যালারিতে হাতে গোনা কয়েকজন দর্শক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। অথচ আজ দুপুর ১টায় চট্টগ্রাম রয়্যালস ও নোয়াখালী এক্সপ্রেসের মধ্যকার বিপিএলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি মাঠে গড়ানোর কথা ছিল।
ঘড়ির কাঁটা ২টা পার হয়ে গেলেও টস করার জন্য মাঠে নেই কোনো অধিনায়ক। মাঠের বাইরে বনানীর একটি হোটেলে তখন চলছে অন্য এক লড়াই। বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে ক্রিকেটারদের অনড় অবস্থানের কারণে অচল হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট।
মাঠ কেন ফাঁকা? ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন গতরাতেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ক্রিকেটারদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম পদত্যাগ না করা পর্যন্ত কোনো ম্যাচ খেলা হবে না। আজ মাঠের চিত্র বলছে, ক্রিকেটাররা তাঁদের কথায় অনড়। কোনো দলের ক্রিকেটাররাই স্টেডিয়ামে আসেননি। সংবাদকর্মীরাও মিরপুর ছেড়ে ছুটে গেছেন বনানীতে, যেখানে কোয়াব তাঁদের সর্বশেষ অবস্থান জানানোর জন্য সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে।
বিসিবির পক্ষ থেকে ব্যবস্থা ও ক্রিকেটারদের সমর্থন বিসিবি অবশ্য হাত গুটিয়ে বসে নেই। গতকাল রাত থেকেই তারা ক্রিকেটারদের ক্ষোভ প্রশমনে কাজ করছে। বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটি ইতোমধ্যে দুই দফায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ক্রিকেটারদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। এমনকি বিতর্কিত মন্তব্য করা পরিচালক নাজমুল ইসলামকে কড়া ভাষায় তিরস্কার করেছেন অন্য পরিচালকরা।
বোর্ড আজ সকালে দ্বিতীয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, নাজমুল ইসলামকে এরই মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। বিসিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নাজমুলের মন্তব্যের পর বোর্ড দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা নিয়েছে। কাল রাত ২টায় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। যেকোনো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ৪৮ ঘণ্টা সময় দিতে হয়। বোর্ড যেখানে খেলোয়াড়দের পাশে আছে, সেখানে খেলা বয়কট করা কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
আইনি জটিলতা ও কোয়াবের অনড় অবস্থান বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, বোর্ড চাইলেই কোনো নির্বাচিত পরিচালককে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কার করতে পারে না। যদি না তিনি নিজে থেকে পদত্যাগ করেন, তবে তাঁকে সরানোর জন্য একটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন বনানীর সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যতক্ষণ না ওই পরিচালক পদত্যাগ করছেন, ততক্ষণ ক্রিকেটাররা মাঠে ফিরবেন না। ক্রিকেটারদের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে বিপিএলের আজকের দুটি ম্যাচই মাঠে না গড়ানোর সম্ভাবনা শতভাগ।
পেশাদারত্ব নিয়ে প্রশ্ন ক্রিকেটারদের এই কঠোর অবস্থান নিয়ে বোর্ডের ভেতরে ও বাইরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। বিসিবির এক পরিচালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বোর্ড যেখানে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, সেখানে সেই সময়টুকু না দিয়ে খেলা বন্ধ রাখা কোনোভাবেই পেশাদার আচরণ হতে পারে না। এতে বাংলাদেশের ক্রিকেট এবং খোদ ক্রিকেটারদেরই আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে কোয়াবের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও। সংশ্লিষ্টরা জানতে চেয়েছেন, খেলা বয়কটের মতো বড় সিদ্ধান্ত কি সব স্তরের ক্রিকেটারদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে, নাকি এটি গুটিকয়েক নেতার সিদ্ধান্ত?
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ বিপিএল একটি আন্তর্জাতিক মানের টুর্নামেন্ট, যেখানে অনেক বিদেশি খেলোয়াড় ও সম্প্রচার স্বত্ব জড়িত। ক্রিকেটারদের এই ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হলে বিসিবিকে বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।
অন্যদিকে, ক্রিকেটাররা মনে করছেন, আত্মসম্মানের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, বিসিবির শীর্ষ পর্যায়ের কর্তারা কোয়াব নেতাদের সাথে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে নাজমুল ইসলাম নিজে থেকে পদত্যাগ না করলে এই অচলাবস্থা সহজে কাটবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন