বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গনে গত কয়েকদিন ধরে চলা অস্থিরতা নিরসনে ক্রিকেটাররা কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও, নতুন করে তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের কুরুচিপূর্ণ ও আপত্তিকর মন্তব্যের প্রতিবাদে যে ধর্মঘট বা অচলাবস্থা শুরু হয়েছিল, তা নিরসনে ক্রিকেটাররা শর্তসাপেক্ষে মাঠে ফেরার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকে বিসিবি সভাপতিকে একটি সমঝোতা প্রস্তাব দেওয়া হয়।
ক্রিকেটারদের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ক্রিকেট খেলোয়াড়দের সংগঠন কোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন ও দেশের কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটার বিসিবি প্রধানের সঙ্গে ফোনে দীর্ঘ আলাপ করেন। ক্রিকেটারদের অবস্থান এখন স্পষ্ট, তারা ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে মাঠে ফিরতে চান।
বিশেষ করে বর্তমানে অনূর্ধ্ব ১৯ দল এবং জাতীয় নারী দল দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ব্যস্ত রয়েছে। একই সাথে আসন্ন বিপিএল আয়োজনের বিষয়টিও ক্রিকেটারদের ভাবনায় রয়েছে। তারা চান না মাঠের বাইরের এই বিতর্ক মাঠের খেলার ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলুক।
তবে ক্রিকেটারদের এই নমনীয়তা একটি বড় শর্তের ওপর নির্ভরশীল। তাদের দাবি, বোর্ড পরিচালক নাজমুল ইসলামকে তার করা আপত্তিকর মন্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে, হয় সংবাদমাধ্যমে অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, দুঃখ প্রকাশ করতে হবে এবং ক্ষমা চাইতে হবে। পাশাপাশি বিসিবি তার বিরুদ্ধে যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রাথমিক ঘোষণা দিয়েছিল, তা কোনোভাবেই শিথিল করা যাবে না।
বিসিবির অনড় অবস্থান ক্রিকেটারদের এই শর্তে সায় দেননি বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম। ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকে যখন ফোনে কথা বলা হচ্ছিল, তখন বিসিবি সভাপতির সাথে আরও কয়েকজন প্রভাবশালী পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। স্পিকার অন রাখা ওই কথোপকথনে আমিনুল ইসলাম সাফ জানিয়ে দেন, ক্রিকেটারদের দেওয়া এই শর্ত মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
বিসিবির একটি অংশের মতে, একজন বোর্ড পরিচালকের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি বোর্ডের ভাবমূর্তির জন্য নেতিবাচক হতে পারে। যদিও নাজমুল ইসলামের মন্তব্যকে বোর্ড ব্যক্তিগত মন্তব্য হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু ক্রিকেটাররা মনে করছেন যেহেতু তিনি বোর্ডের একটি পদে আসীন, তাই তার বক্তব্যের দায়ভার বোর্ডকেও নিতে হবে।
ঘটনার নেপথ্যে বিতর্কের শুরু হয় কয়েকদিন আগে, যখন বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমে ক্রিকেটারদের মান মর্যাদা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। তার সেই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ক্রিকেটারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
অনেক সিনিয়র ক্রিকেটার সরাসরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর প্রতিবাদ জানান এবং দাবি করেন যে সম্মানহানি করে আর যাই হোক ক্রিকেটের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এরই ধারাবাহিকতায় ক্রিকেটাররা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিসিবির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং নাজমুল ইসলামের পদত্যাগ অথবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। বিসিবি তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলেও ক্রিকেটাররা এতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি।
বিপিএল ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা আগামীকাল থেকেই ক্রিকেটারদের মাঠে নামার কথা ছিল যদি আজ সমঝোতা হতো। কিন্তু বিসিবি সভাপতির না বলার পর ক্রিকেটাররা তাদের পূর্বের অবস্থানেই অটল থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর ফলে সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে পড়েছে আসন্ন বিপিএল। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো এই অচলাবস্থায় চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে। বিদেশি ক্রিকেটারদের আগমন এবং সম্প্রচার স্বত্বসহ নানাবিধ ব্যবসায়িক চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন ঝুলে আছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ ক্রিকেটারদের সূত্রটি বলছে, আমরা ক্রিকেটের ক্ষতি চাই না কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে মাঠে নামা সম্ভব নয়। বোর্ড পরিচালক যা বলেছেন তা দেশের ক্রিকেটের প্রতিটি স্তরের খেলোয়াড়কে আঘাত করেছে। আমরা কেবল একটি প্রকাশ্য ক্ষমা চেয়েছি যা খুব বড় কোনো দাবি ছিল না।
অন্যদিকে বিসিবির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংবাদ সম্মেলন করা হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে আজ গভীর রাত পর্যন্ত বোর্ডের নীতি নির্ধারকরা অভ্যন্তরীণ বৈঠকে বসবেন। ক্রিকেটারদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর বিকল্প কোনো পন্থায় তাদের মাঠে ফেরানো যায় কি না সেটাই এখন বিসিবির বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশের ক্রিকেট প্রেমীরা আশা করছেন উভয় পক্ষ জেদ পরিহার করে দ্রুত একটি সমাধানে পৌঁছাবে। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকায় যখন অনূর্ধ্ব ১৯ দল লড়াই করছে তখন দেশের মাটিতে সিনিয়র ক্রিকেটারদের এই সংকট ক্রিকেটের ভাবমূর্তিকে বিশ্ব দরবারে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। সব মিলিয়ে নাজমুল ইসলামের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংকটের বল এখন বিসিবির কোর্টে।
ক্রিকেটাররা এক ধাপ এগিয়ে এসে সমঝোতার প্রস্তাব দিলেও বিসিবির অনড় অবস্থান সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে। কাল মাঠের খেলা শুরু হবে নাকি স্টেডিয়ামগুলো আবারও জনশূন্য থাকবে তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক ঘণ্টার সিদ্ধান্তের ওপর।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন