২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

ভারতেই খেলতে হবে বাংলাদেশকে: আইসিসি

ক্রীড়া প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম
ভারতেই খেলতে হবে বাংলাদেশকে: আইসিসি

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ। ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই মেগা ইভেন্ট বা বৃহৎ আসরে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো অন্য কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যু বা ক্রীড়াস্থলে সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিসিবি যে জোরালো দাবি জানিয়েছিল, তা আজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে আইসিসি।

বুধবার এক জরুরি ভিডিও কনফারেন্স বা দৃশ্যমান আলোচনার মাধ্যমে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় আইসিসি জানিয়ে দিয়েছে, নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে এবং বাংলাদেশকে ভারতেই খেলতে হবে। অন্যথায় টুর্নামেন্টের মর্যাদা রক্ষায় বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য কোনো দেশকে বিকল্প হিসেবে নেওয়ার কঠোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সংস্থাটি।

মোস্তাফিজ ইস্যু ও নিরাপত্তা শঙ্কা গত ৩ জানুয়ারি ভারতের উগ্রপন্থী কিছু গোষ্ঠীর হুমকির মুখে বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল বা ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার নির্দেশ দেয় বিসিসিআই। এই ঘটনাটি ছিল মূল অগ্নিগর্ভ। বাংলাদেশ সরকার ও বিসিবির যুক্তি ছিল যদি একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা দিতে বিসিসিআই ব্যর্থ হয়, তবে পুরো দলের শত শত সদস্য ও হাজার হাজার বাংলাদেশি সমর্থকদের নিরাপত্তা ভারতের মাটিতে কীভাবে নিশ্চিত হবে? এই যুক্তিতেই ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের মাটিতে খেলতে অনীহা প্রকাশ করে এবং ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়।

তিনটি প্রধান কারণ আইসিসি তাদের সাম্প্রতিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশের অনুরোধ নাকচ করার পেছনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরেছে। প্রথমত, স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়নের অভাব। আইসিসি জানিয়েছে তারা একাধিক স্বাধীন নিরাপত্তা সংস্থার মাধ্যমে ভারতে ভেন্যুগুলোর নিরাপত্তা পর্যালোচনা করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী কোনো সংস্থাই বাংলাদেশ দলের জন্য সেখানে কোনো বিশ্বাসযোগ্য হুমকি খুঁজে পায়নি।

দ্বিতীয়ত, লজিস্টিক বা লজিস্টিক ও সূচিগত জটিলতা। বিশ্বকাপের মতো একটি মেগা ইভেন্ট শুরু হতে আর মাত্র দুই সপ্তাহের কিছু বেশি সময় বাকি। আইসিসির মতে এই মুহূর্তে একটি নির্দিষ্ট দলের জন্য ভেন্যু পরিবর্তন করলে অন্য দলগুলো, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিশ্বব্যাপী সমর্থকদের জন্য বিশাল লজিস্টিক সংকট তৈরি হবে। হোটেল বুকিং, বিমানের টিকিট এবং সম্প্রচার সরঞ্জামের ব্যবস্থাপনা নতুন করে করা অসম্ভব বলে মনে করছে তারা।

তৃতীয়ত, বিপজ্জনক নজির স্থাপনের ঝুঁকি। আইসিসি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে তাদের শাসনব্যবস্থার নিরপেক্ষতার ওপর। তাদের ভাষ্যমতে কোনো অকাট্য প্রমাণ ছাড়াই একটি দলের দাবি মেনে নিলে ভবিষ্যতে অন্যান্য দলগুলোও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণে এমন আবদার করবে। এতে আইসিসির নিরপেক্ষতা ও সততা প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং ভবিষ্যতে বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

বিসিবির ওপর আইসিসির আলটিমেটাম আইসিসি কেবল অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং বিসিবিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য মাত্র এক দিন বা ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বিসিবি যদি ভারত ভ্রমণে রাজি না হয়, তবে বিশ্বকাপের মূল ড্র বা বিন্যাস থেকে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে বিকল্প কোনো দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য একটি বড় ধরণের ধাক্কা হতে পারে। কারণ এতে কেবল বিশ্বকাপ মিস করা নয়, বরং আইসিসির সদস্যপদ ও অনুদানের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মোস্তাফিজ ইস্যুকে বিচ্ছিন্ন বলছে আইসিসি বিসিবি মোস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল ইস্যুটিকে বড় প্রমাণ হিসেবে পেশ করলেও আইসিসি তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। আইসিসির মুখপাত্রের মতে একটি ঘরোয়া লিগ বা আইপিএল এর ঘটনা এবং একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের নিরাপত্তা কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আইসিসি স্পষ্ট করে জানিয়েছে মোস্তাফিজের ঘটনাটি একক, বিচ্ছিন্ন ও অপ্রাসঙ্গিক। তাদের দাবি বিশ্বকাপের জন্য যে ধরণের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার সাথে ঘরোয়া লিগের নিরাপত্তা সংকটের কোনো সম্পর্ক নেই।

বৈশ্বিক রাজনীতি ও পিসিবির সমর্থন এই সংকটে একটি নাটকীয় মোড় আসে যখন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বা পিসিবি বাংলাদেশের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আইসিসিকে চিঠি দেয়। এর আগে পাকিস্তানও ভারতের মাটিতে খেলতে নিরাপত্তা শঙ্কার কথা জানিয়েছিল। পিসিবির এই সমর্থন বিসিবির অবস্থানকে আন্তর্জাতিক মহলে কিছুটা শক্ত করলেও আইসিসি তাদের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে।

আইসিসি জোর দিয়ে বলেছে যে তারা আয়োজক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক এবং উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পেয়েছে। এখন বল বিসিবির কোর্টে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নির্ধারিত হবে টাইগাররা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চে থাকছে, নাকি মাঠের লড়াইয়ের আগেই বিদায় নিচ্ছে। ক্রিকেট এখন আর কেবল খেলার মাঠে সীমাবদ্ধ নেই, এটি ঢুকে পড়েছে ভূ রাজনীতি ও নিরাপত্তার জটিল সমীকরণে।

জেএইচআর