বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে গত তিন সপ্তাহ ছিল যেন কোনো থ্রিলার উপন্যাসের পাতা। একদিকে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসর টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ, অন্যদিকে জাতীয় মর্যাদা ও আত্মসম্মানের প্রশ্ন। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট। আইসিসি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপ খেলতে হলে ভারতেই যেতে হবে; অন্যদিকে সরকার ও বিসিবি অনড়—অসম্মান নিয়ে ভারতের মাটিতে পা রাখবে না টাইগাররা।
ঘটনার শুরুটা বেশ আকস্মিক। আইপিএলের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) তাদের স্কোয়াড থেকে বাংলাদেশের কাটার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। জানা যায়, এর পেছনে ছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিসিআইয়ের প্রত্যক্ষ নির্দেশ। বিষয়টি কেবল একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাংলাদেশের ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল একে জাতীয় অপমান হিসেবে অভিহিত করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে দেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানান।
৪ জানুয়ারি টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য বাংলাদেশ দল ঘোষণা করা হলেও আনন্দ ফিকে হয়ে যায় এক বড় ঘোষণায়। ক্রীড়া উপদেষ্টা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না। বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসিকে অনুরোধ করে যেন বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে অন্য কোনো নিরপেক্ষ দেশে নেওয়া হয়।
পরের দিন অর্থাৎ ৫ জানুয়ারি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কড়া পদক্ষেপ নেয়। মোস্তাফিজের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের প্রতিবাদে বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার স্থায়ীভাবে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
৬ জানুয়ারি আইসিসির সঙ্গে বিসিবির ভার্চ্যুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, লজিস্টিক ও বাণিজ্যিক কারণে ভারতের বাইরে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো সরানো অসম্ভব। তবে বিসিবিও দমে যায়নি। ৭ জানুয়ারি ক্রীড়া উপদেষ্টা সাফ জানিয়ে দেন, "দেশের মর্যাদার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।" ৮ জানুয়ারি বিসিবি দ্বিতীয়বারের মতো আইসিসিকে ইমেইল করে শ্রীলঙ্কায় ভেন্যু স্থানান্তরের প্রস্তাব দেয়।
১২ জানুয়ারি সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। ক্রীড়া উপদেষ্টা জানান, আইসিসির নিরাপত্তা দল খোদ ভারতের মাটিতে মোস্তাফিজসহ বাংলাদেশ দলের তিন ধরনের বড় ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছে। এই নিরাপত্তা উদ্বেগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিসিবি ভারতে না যাওয়ার অবস্থানে অনড় থাকে। ১৩ জানুয়ারি ভিডিও কনফারেন্সে আবারও ভেন্যু পরিবর্তনের জন্য আইসিসিকে চাপ দেয় বাংলাদেশ।
১৭ জানুয়ারি ঢাকায় আইসিসি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বিসিবি একটি নতুন কৌশল প্রয়োগ করে। তারা প্রস্তাব দেয়, যদি ভেন্যু সরানো না যায় তবে 'বি' গ্রুপে থাকা আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রুপ অদলবদল করা হোক। অর্থাৎ বাংলাদেশ এমন ভেন্যুতে খেলুক যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের বিতর্কিত প্রভাবমুক্ত।
১৮ জানুয়ারি এই লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলো জানায়, বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত না খেলে, তবে পিসিবিও তাদের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে। দক্ষিণ এশিয় ক্রিকেটে এক নতুন মেরুকরণের আভাস পাওয়া যায়।
১৯ জানুয়ারি আইসিসি পাল্টা চাপ প্রয়োগ শুরু করে। শোনা যায়, বাংলাদেশ না খেললে বিকল্প হিসেবে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে আইসিসি। একইসঙ্গে বাংলাদেশকে একটি চূড়ান্ত সময়সীমা (ডেডলাইন) বেঁধে দেওয়া হয়। ২০ জানুয়ারি আসিফ নজরুল আবারও গর্জে ওঠেন। তিনি বলেন, "কোনো অযৌক্তিক চাপে পড়ে বাংলাদেশ মাথা নত করবে না।" একই দিনে পিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসিকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশের দাবির প্রতি সমর্থন জানায়।
গতকাল ২১ জানুয়ারি আইসিসি বোর্ড সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় যে, বিশ্বকাপের পূর্বনির্ধারিত সূচিতে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সব দাবি নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। আইসিসি বিসিবিকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে হবে—হয় তারা নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ভারতে খেলবে, নয়তো বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—শেষ পর্যন্ত কী করবে বাংলাদেশ? এই সংকটের দুটি সম্ভাব্য পরিণতি হতে পারে:
১. বর্জন ও ক্রিকেটীয় নিষেধাজ্ঞা: বাংলাদেশ যদি জাতীয় সম্মানের কথা চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত না যায়, তবে আইসিসির কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে বিসিবিকে। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একঘরে হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
২. শর্তসাপেক্ষে অংশগ্রহণ: যদি আইসিসি বিশেষ নিরাপত্তা বলয় এবং বিশেষ মর্যাদার নিশ্চয়তা দেয়, তবে বিসিবি হয়তো শেষ মুহূর্তে নমনীয় হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ ক্রিকেট ভক্তদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বড় একটি অংশ মনে করছে, মোস্তাফিজ এবং বাংলাদেশের সাথে ভারতের আচরণ দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ, তাই এই ‘ভারত-বর্জন’ সিদ্ধান্ত সঠিক। অন্য অংশটি মনে করছে, মাঠের লড়াইয়েই যোগ্য জবাব দেওয়া উচিত, টুর্নামেন্ট বর্জন করে নয়।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য আজ ২২ জানুয়ারি একটি ঐতিহাসিক দিন হয়ে থাকবে। বিসিবির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে আগামী কয়েক বছরের ক্রিকেটের গতিপথ। মোস্তাফিজকে দিয়ে যে আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়েছিল, তা এখন দাবানল হয়ে আইসিসির দরজায় আছড়ে পড়ছে। বাংলাদেশ কি পারবে নিজের সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে বিশ্বমঞ্চে ফিরতে? নাকি ক্রিকেটের মানচিত্র থেকে সাময়িকভাবে হারিয়ে যাবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা? উত্তরটা এখন সময়ের হাতে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন