টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের ড্রেসিংরুমের চেয়ে বেশি উত্তাপ ছড়াচ্ছে আইসিসির সদর দপ্তর আর বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট বোর্ডগুলোর অন্দরমহলে।
নিরাপত্তাশঙ্কার দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করা এবং আইসিসির কঠোর অবস্থানের কারণে টাইগারদের বদলে স্কটল্যান্ডের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ক্রিকেট মহলে বইছে সমালোচনার ঝড়। ইংল্যান্ডের সাবেক লিজেন্ডারি ব্যাটসম্যান মার্ক বুচার এ পরিস্থিতিকে ক্রিকেটের মর্যাদা রক্ষার একটি কঠোর কিন্তু প্রয়োজনীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
উইজডেন ক্রিকেট উইকলি পডকাস্টে কথা বলতে গিয়ে বুচার গত বছরের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতের অবস্থান এবং বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা টেনেছেন।
তার মতে, ভারত যখন পাকিস্তানে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তখন আইসিসি তাদের জন্য হাইব্রিড মডেল বা নিরপেক্ষ ভেন্যুর ব্যবস্থা করে কাঠামো বদলে দিয়েছিল।
বুচার কিছুটা কটাক্ষের সুরেই বলেন, চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ক্ষেত্রে ভারত কী অবস্থান নেবে, সেটা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে দূর মহাকাশ থেকেও দেখা যাচ্ছিল। তখন আইসিসি ভারতকে মানিয়ে নিতে টুর্নামেন্টের কাঠামো পাল্টেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইসিসি কেন অনমনীয় থাকল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বুচার এ কঠোরতাকে ক্রিকেটের স্বচ্ছতার জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
ভারতের ভেন্যু নিয়ে ৪ জানুয়ারি বিসিবি যে আপত্তির কথা জানিয়েছিল, তা ২১ জানুয়ারি আইসিসি নাকচ করে দেয়। বাংলাদেশ তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় আইসিসি স্কটল্যান্ডকে বেছে নেয়।
বুচার মনে করেন, কোনো দল যদি কোনো বিশেষ দেশে গিয়ে খেলতে না চায়, সেটা সরকারি চাপে হোক বা নিজেদের সিদ্ধান্তে, তবে তাদের ছাড়াই টুর্নামেন্ট চালানো উচিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার ঘটনাটি একটি দৃষ্টান্ত হওয়া উচিত। যদি আপনার সমস্যা থাকে, তবে আপনি সরে যান, অন্য কেউ খেলুক। ক্রিকেটকে কোনো দলের মর্জির ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। খেলাটির মর্যাদা অর্থের চেয়ে বড় হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশকে বঞ্চিত করা হলে পাকিস্তানও টুর্নামেন্ট বর্জনের চিন্তা করবে। তবে বুচার মনে করেন, এখন আর পাকিস্তানের ফেরার পথ নেই।
তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, পাকিস্তান বলেছিল তারা বাংলাদেশের পাশে থাকবে। এখন তারা কী করবে? তারা কি সত্যিই সরে যাবে? আমার মনে হয় অনেক দেরি হয়ে গেছে। নাকভি আজ শুক্রবার বা আগামী রোববারের মধ্যে পাকিস্তানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর কথা রয়েছে, যা নিয়ে পুরো ক্রিকেট বিশ্ব উৎকণ্ঠায়।
বুচারের বক্তব্যে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ছিল, আইসিসি কি তবে কেবল শক্তিশালী দেশগুলোর জন্য নিয়ম পাল্টায়? ভারত যখন পাকিস্তানে যেতে চায় না, তখন নিরপেক্ষ ভেন্যু তৈরি হয়। কিন্তু বাংলাদেশ যখন ভারতে যেতে চায় না, তখন তাদের টুর্নামেন্ট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
বুচার মনে করেন, এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র ন্যায্য পথ হলো নিয়ম সবার জন্য সমান রাখা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মাঠে নামা অথবা স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়িয়ে অন্যকে সুযোগ দেওয়া, এটাই হওয়া উচিত ক্রিকেটের আগামীর পথ।
৭১টি টেস্ট খেলা মার্ক বুচার মাঠের ক্রিকেটে যতটা দৃঢ় ছিলেন, মাঠের বাইরের বিশ্লেষণেও ততটাই স্পষ্টভাষী। তিনি মনে করেন, ক্রিকেটে বেশির ভাগ অর্থ যেখান থেকে আসে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত খেলার স্বচ্ছতা। স্কটল্যান্ডের অন্তর্ভুক্তিকে তিনি একটি ছোট দলের জন্য বড় সুযোগ এবং নীতিহীন দাবির বিরুদ্ধে একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখছেন।
৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপটি ক্রিকেটীয় লড়াইয়ের চেয়ে রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে বেশি পরিচিতি পাচ্ছে।
বাংলাদেশের অনুপস্থিতি এবং পাকিস্তানের সম্ভাব্য বর্জনের হুমকি টুর্নামেন্টের জৌলুস কমিয়ে দিলেও মার্ক বুচারের মতে এটি ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদী শৃঙ্খলার জন্য একটি মাইলফলক। এখন দেখার বিষয়, আইসিসির এ কঠোর অবস্থান ক্রিকেটে সমতা আনে নাকি বিভাজন আরও বাড়িয়ে দেয়।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন