ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এবং '৬ হাজার কোটি টাকার' মহারণ হিসেবে পরিচিত ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ে আরও একবার শেষ হাসি হাসল ভারত। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ‘এ’ গ্রুপের হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে ৬১ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে সূর্যকুমার যাদবের দল। এই জয়ে টানা তিন জয় নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে সুপার এইট নিশ্চিত করল টিম ইন্ডিয়া। অন্যদিকে, এই হারের ফলে পাকিস্তানের সুপার এইটে যাওয়ার সমীকরণ এখন জটিল ও খাদের কিনারায়।
টসে হেরে প্রথমে ব্যাটিংয়ে নামা ভারতের শুরুটা ছিল নাটকীয়। ইনিংসের প্রথম ওভারেই অভিষেক শর্মাকে (০) হারিয়ে হোঁচট খায় নীল জার্সিধারীরা। পাকিস্তানের অধিনায়ক সালমান আগা নিজেই বল হাতে তুলে নিয়ে প্রথম ওভারে মাত্র ১ রান দিয়ে উইকেট তুলে নেন। তবে এরপরই শুরু হয় ঈশান কিষাণের ব্যাটিং তান্ডব।
ঈশান কিষাণ যেন খুনে মেজাজে মাঠে নেমেছিলেন। শাহিন শাহ আফ্রিদি থেকে শুরু করে শাদাব খান—কাউকেই রেহাই দেননি তিনি। মাত্র ২৭ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করে ঈশান যখন থামেন, তখন তার নামের পাশে ৪০ বলে ৭৭ রান। ১০টি চার ও ৩টি ছক্কায় সাজানো এই ইনিংসটিই ভারতের বিশাল সংগ্রহের ভিত গড়ে দেয়। এটি পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে ভারতের কোনো ব্যাটসম্যানের তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর।
দ্বিতীয় উইকেটে ৪৬ বলে ৮৭ রানের ঝোড়ো জুটি গড়েন ঈশান ও তিলক বর্মা। অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব ২৯ বলে ৩২ এবং তিলক বর্মা ২৫ রান করেন। শেষের দিকে হার্দিক পান্ডিয়া শূন্য রানে ফিরলেও শিবম দুবের ২৭ ও রিংকু সিংয়ের ছোট ক্যামিও ভারতকে ১৭৫ রানের লড়াকু পুঁজিতে পৌঁছে দেয়। সাইম আইয়ুব ৩টি উইকেট নিলেও বাকি বোলাররা ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের রানের গতি থামাতে হিমশিম খেয়েছেন।
১৭৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইনিংসের শুরুতেই পথ হারায় পাকিস্তান। প্রথম ওভারেই হার্দিক পান্ডিয়া কোনো রান না দিয়ে সাহিবজাদা ফারহানকে (০) প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠান। দ্বিতীয় ওভারে আক্রমণে এসে যশপ্রীত বুমরা যেন আগুন ঝরানো শুরু করেন। ওভারের প্রথম বলে ছক্কা খেয়েও পরের বলে সাইম আইয়ুবকে এবং শেষ বলে সালমান আগাকে ফিরিয়ে পাকিস্তানের স্কোরকার্ডকে ১৩/৩-এ পরিণত করেন।
বাবর আজম যখন ক্রিজে আসেন, তখন গ্যালারিতে পাকিস্তান সমর্থকদের আশা জেগেছিল। কিন্তু বাবর ৭ বলে মাত্র ৫ রান করে অক্ষর প্যাটেলের বলে বোল্ড হলে পাকিস্তানের হার কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ৩৪ রানে ৪ উইকেট হারানো পাকিস্তানকে কিছুক্ষণ টানেন উসমান খান। তার ৩৪ বলে ৪৪ রানের ইনিংসটি কেবল ব্যবধানই কমিয়েছে।
ভারতের সাতজন বোলারের মধ্যে ছয়জনই উইকেটের দেখা পেয়েছেন। এটি ছিল ভারতের বোলিং ইউনিটের একটি কমপ্লিট পারফরম্যান্স।
হার্দিক পান্ডিয়া (২/১৬) এবং যশপ্রীত বুমরা (২/১৭) ইনিংসের শুরুতেই পাকিস্তানের কোমর ভেঙে দেন। বরুণ চক্রবর্তী এবং অক্ষর প্যাটেল মাঝের ওভারগুলোতে উইকেট নিয়ে রানের চাকা চেপে ধরেন। বরুণ ১৬তম ওভারে টানা দুই বলে উইকেট নিয়ে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগালেও উসমান তারিক তা রুখে দেন।
শেষ পর্যন্ত ১৮ ওভারে ১১৪ রানেই গুটিয়ে যায় পাকিস্তানের ইনিংস। শাহিন আফ্রিদি ২৩ রানে অপরাজিত থাকলেও তা জয়ের জন্য ছিল নেহাতই অপ্রতুল।
এই হারের ফলে পাকিস্তানের ভাগ্য এখন সুতোয় ঝুলছে। ৩ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নেট রান রেটে পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে। পাকিস্তানের পরবর্তী এবং শেষ ম্যাচ নামিবিয়ার বিপক্ষে। সেই ম্যাচে কেবল জিতলেই হবে না, বড় ব্যবধানে জিততে হবে। যদি পাকিস্তান কোনো কারণে নামিবিয়ার কাছে হেরে যায়, তবে গতবারের মতো এবারও প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হবে বাবর-সালমানদের। অন্যদিকে, ৩ ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে ভারত এখন নির্ভার।
ক্রিকেটীয় লড়াইয়ের পাশাপাশি এই ম্যাচে বড় প্রভাব ফেলেছিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। বিসিবি-আইসিসি দ্বন্দ্ব এবং পাকিস্তানের বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকির পর শেষ পর্যন্ত দুই দেশ মাঠে নামলেও খেলোয়াড়দের মধ্যে শীতল সম্পর্ক স্পষ্ট ছিল। টসের সময় দুই অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব এবং সালমান আগা একে অপরের সঙ্গে হাত মেলাতেন কি না, তা নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন ছিল। বাস্তবে তারা সেই নেতিবাচক ধারা বজায় রেখে করমর্দন এড়িয়ে চলেন।
এমনকি গ্যালারিতে নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা প্রেমাদাসায় আড়াই হাজার পুলিশ মোতায়েন ছিল। তবে সব ছাপিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীরা উপভোগ করেছেন একটি একপেশে কিন্তু রোমাঞ্চকর ‘ব্যাটল অব নার্ভ’।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন