শেষ মুহূর্তের গোলবন্যা আর ভুলের মহড়া, বিশ্বকাপে গোল উৎসবের আসল রহস্য

স্পোর্টস ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম
শেষ মুহূর্তের গোলবন্যা আর ভুলের মহড়া, বিশ্বকাপে গোল উৎসবের আসল রহস্য

চলমান বিশ্বকাপে গোলের গ্রাফ যেভাবে ঊর্ধ্বমুখী, তাতে ফুটবলপ্রেমীরা যেমন রোমাঞ্চকর এক অনুভূতি পাচ্ছেন, তেমনই ফুটবল বিশ্লেষকরা বসছেন চুলচেরা বিশ্লেষণে। জার্মানির আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে জয়ের পর টুর্নামেন্টের মোট গোল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৫ এ। তবে এই ১০৫টি গোলের পরিসংখ্যানের ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি অন্যরকম প্রবণতা।

দেখা যাচ্ছে, ম্যাচগুলোর শেষ কোয়ার্টার বা শেষ ১৫ মিনিটে গোলের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে খেলোয়াড়দের বড় বড় ভুল এবং ফিফা প্রবর্তিত নতুন কিছু নিয়মের কৌশলগত ব্যবহার।

একই সাথে টুর্নামেন্টের শুরুতেই মহাতারকাদের দুর্দান্ত ফর্ম এবারের বিশ্বকাপকে করে তুলেছে গোল উৎসবের এক মঞ্চ। এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কেন এবারের বিশ্বকাপে এত বেশি গোল হচ্ছে, কীভাবে পানি পানের বিরতি বা হাইড্রেশন ব্রেক ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে এবং কেন মেসি, এমবাপ্পে, হাল্যান্ডদের মতো শীর্ষ তারকারা এবার শুরু থেকেই অপ্রতিরোধ্য ফর্মে রয়েছেন।

মাসের ৭৬ মিনিট থেকে খেলা শেষের বাঁশি বা ফুল টাইম বাজার মধ্যবর্তী সময়ে চলমান টুর্নামেন্টের ১০৫টি গোলের মধ্যে ৩০টি গোলই এসেছে। শতকরা হিসেবে যা দাঁড়ায় ২৮.৬%। এই পরিসংখ্যানটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ম্যাচের শেষ ভাগে এত বেশি গোল হওয়ার রেকর্ডের তালিকায় এটি ষষ্ঠ স্থানে উঠে আসার পথে রয়েছে এবং ২০১৪ সালের পর এটিই শেষ মুহূর্তে সর্বোচ্চ গোল হওয়ার রেকর্ড।

স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট এবং ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে গোল বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, শারীরিক ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতি। আধুনিক ফুটবলের গতি অনেক বেশি। ম্যাচের শেষ ভাগে এসে খেলোয়াড়দের শারীরিক শক্তির ক্ষয় ঘটে, যার ফলে রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন এবং ভুল পজিশনিংয়ের কারণে গোল হজম করেন।

দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত ইনজুরি টাইম বা যোগ করা সময়। বর্তমান ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, ম্যাচে নষ্ট হওয়া সময়ের নিখুঁত হিসাব রেখে অতিরিক্ত সময়, যা ১০ থেকে ১২ মিনিট পর্যন্ত হচ্ছে, তা যোগ করা হচ্ছে। ফলে ম্যাচগুলো আসলে ৯০ মিনিটের না হয়ে প্রায় ১০০ বা তার বেশি মিনিটের হচ্ছে, যা শেষ মুহূর্তে গোল করার সুযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এবারের বিশ্বকাপে আরও একটি জিনিস চোখে পড়ার মতো, তা হলো বিপজ্জনক জায়গায় খেলোয়াড়দের মারাত্মক সব ভুল, যা সরাসরি প্রতিপক্ষকে গোল উপহার দিচ্ছে। রক্ষণভাগ বা মাঝমাঠে বলের দখল হারানোর খেসারত দিতে হচ্ছে দলগুলোকে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা গেছে তিউনিসিয়া বনাম সুইডেনের মধ্যকার ম্যাচে। 

তিউনিসিয়ার এলিস স্কিরি নিজেদের ডি বক্সের কাছাকাছি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক জায়গায় বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসেন। সেই সুযোগ লুফে নিতে ভুল করেননি সুইডিশ স্ট্রাইকার ভিক্টর গিওকেরেস। তিনি দুর্দান্ত এক গোল করে দলকে এগিয়ে নেন। পুরো ম্যাচ জুড়ে উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়া এমন সব ভুল করেছে যা আন্তর্জাতিক ফুটবলে কাম্য নয়। তারা মোট ছয়টি এমন ভুল করেছে যা থেকে সরাসরি প্রতিপক্ষ শট নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। আর এই ছয়টি ভুলের মধ্যে চারটিই সরাসরি গোলে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলস্বরূপ, গ্রাহাম পটারের অধীনে থাকা ক্ষুরধার সুইডেন দল তিউনিসিয়াকে তাদের উদ্বোধনী ম্যাচে ৫-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে।

বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে হাইড্রেশন ব্রেক বা পানি পানের বিরতি। যদিও গ্যালারিতে থাকা দর্শকরা অনেক ম্যাচে এই বিরতির সময় ভুয়ো আওয়াজ বা বু ধ্বনি দিয়ে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করছেন, কিন্তু মাঠের খেলায় এটি দলগুলোর জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

অনেক বিশ্লেষকের প্রশ্ন, এই হাইড্রেশন ব্রেক কি দলগুলোকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার এবং পরবর্তীতে গোল করার সুযোগ করে দিচ্ছে? নিয়ম অনুযায়ী, টুর্নামেন্টের ১০৪টি ম্যাচেই এই তিন মিনিটের বাধ্যতামূলক বিরতি রাখার নিয়ম করা হয়েছে। মূলত প্রচণ্ড গরমে খেলোয়াড়দের শরীর সজল বা হাইড্রেটেড রাখার জন্য এই ব্যবস্থা।

কাগজে কলমে এটি পানি পানের বিরতি হলেও, চতুর হেড কোচরা এটিকে ব্যবহার করছেন মিনি টাইমআউট হিসেবে। এই তিন মিনিটে তারা খেলোয়াড়দের কাছে ডেকে নতুন কৌশল বা ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন বুঝিয়ে দিচ্ছেন এবং নতুন নির্দেশনা দিচ্ছেন। 

সুইজারল্যান্ডের ম্যানেজার মুরাত ইয়াকিন এই ব্যবস্থার প্রশংসা করে খোলাখুলিই বলেছেন, আপনি এই সময়ে খেলোয়াড়দের বলে দিতে পারেন তাদের ঠিক কী করতে হবে। আমরা এমনকি তাদের ট্যাবলেটে বা স্ক্রিনে লাইভ ইমেজ বা ছবি দেখাতে পারি। এই তিন মিনিটের মধ্যে আমরা তাদের সাথে কথা বলতে পারি, ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন বা খেলোয়াড় বদল নিয়ে আলোচনা করতে পারি। এই হাইড্রেশন ব্রেকের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। 

নিউ জার্সিতে মরক্কোর বিরুদ্ধে তাদের উদ্বোধনী ম্যাচে প্রথমার্ধে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল সেলেসাওরা। মাঠের খেলায় তাদের বেশ দিশেহারা লাগছিল। কিন্তু প্রথমার্ধের মাঝের দিকের পানি পানের বিরতিতে কোচ কার্লো আনচেলত্তি তার দলের খেলোয়াড়দের ডেকে ট্যাকটিক্যাল রি বুট করেন। ফলাফল হিসেবে দেখা যায়, খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই ব্রাজিল গোল শোধ করে ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে আনে।

বিগত বিশ্বকাপ বা ইউরো কাপের দিকে তাকালে দেখা যেত, ইউরোপের কঠিন ঘরোয়া মরশুম শেষ করে আসার কারণে বড় বড় তারকারা টুর্নামেন্টের শুরুতে পুরোপুরি ফিট থাকতেন না বা ফর্মে ফিরতে সময় নিতেন। যেমনটা দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ইউরো কাপে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেনের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মহাতারকারা এবার টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ থেকেই উড়ছেন। 

আর্জেন্টিনার জাদুকর লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করেছেন। এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ গোল করার একটি অনন্য রেকর্ড স্পর্শ করেছেন। ফুটবলের জাদুকরকে মাঠে দেখে মনেই হয়নি তিনি ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন, বরং তার আত্মবিশ্বাস ছিল তুঙ্গে।

অন্যান্য বড় নামগুলোও পিছিয়ে নেই। কিলিয়ান এমবাপ্পে সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচে একাই জোড়া গোল করে ফ্রান্সের জয় সহজ করেছেন। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ব্রাজিলের হয়ে খেলা দুটি ম্যাচের প্রতিটিতেই জালের দেখা পেয়েছেন এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। আর্লিং হাল্যান্ড ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ২০২৫, ২৬ মরশুমে ২৭ গোল করে প্রিমিয়ার লীগের গোল্ডেন বুট জেতা এই নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার বিশ্বকাপে ইরাকের বিরুদ্ধে ৪-১ গোলের জয়ে জোড়া গোল করেছেন।

হ্যারি কেন, যিনি ইংল্যান্ড অধিনায়ক, ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে জোড়া গোল করে নিজের জাত চিনিয়েছেন। টমাস ফ্রাঙ্ক এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, হ্যারি কেন, লিওনেল মেসি কিংবা আর্লিং হাল্যান্ড, প্রত্যেককেই মাঠে দেখে মনে হচ্ছে তারা তাদের ক্যারিয়ারের সেরা ফিটনেস নিয়ে খেলছেন। কোনো ক্লান্তির ছাপ নেই তাদের শরীরে।

ভিভিডি স্পোর্টের সাথে আলাপকালে ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক ডিফেন্ডার মিকাহ রিচার্ডস ফরোয়ার্ডদের এই গোলক্ষুধা এবং আত্মবিশ্বাসের ওপর আলোকপাত করেছেন। তার মতে, এবারের বিশ্বকাপ কৌশলের চেয়ে বেশি মানসিকতার খেলায় রূপ নিয়েছে।

রিচার্ডস বলেন, এই বিশ্বকাপের ফরোয়ার্ডদের দিকে তাকালে তাদের চোখে মুখে এক অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাস দেখা যায়। মাঠে নামার সময় প্রতিটি আক্রমণভাগের খেলোয়াড় মনে করেন যে তিনি গোল পাবেনই। সবাই নিজেকে উজার করে দিচ্ছেন। এটি এখন আর শুধু জটিল ট্যাকটিক্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বিশ্বকাপে খেলার যে একটা আনন্দ বা ফিল গুড ফ্যাক্টর, সেটাই খেলোয়াড়দের সেরাটা বের করে আনছে।

২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং হাই স্কোরিং টুর্নামেন্ট হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকার সব উপাদান প্রদর্শন করছে। একদিকে যেমন ডিফেন্ডারদের ওপর আধুনিক হাই প্রেসিং ফুটবলের চাপ মারাত্মক ভুল ডেকে আনছে, অন্যদিকে হাইড্রেশন ব্রেকের মতো ছোট ছোট বিরতিগুলো কোচেদের দিচ্ছে নতুন চাল চালার সুযোগ। 

তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে, বিশ্বফুটবলের সেরা তারকাদের চোটমুক্ত এবং দুর্দান্ত ফিটনেসে মাঠে পাওয়াটাই এই গোলবন্যার প্রধান কারণ। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বার্তাটা স্পষ্ট, ম্যাচের শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত টিভি স্ক্রিন থেকে চোখ সরানোর কোনো উপায় নেই।