৩৯ বছর বয়সে এসেও লিওনেল মেসি প্রমাণ করছেন কেন তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা (GOAT) বলা হয়। ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলের নিউক্লিয়াস হিসেবে মাঠে নেমেছেন তিনি। প্রথম রাউন্ডের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে মেসির পা থেকে এসেছে জাদুকরী সব গোল এবং অ্যাসিস্ট।
বর্তমানে তিনি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় শীর্ষে, অবস্থান করছেন। গোল্ডেন বুটের এই দৌড়ে বাকিদের চেয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে আছেন আলবিসেলেস্তে অধিনায়ক। আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের প্রতিটি আক্রমণই যেন মেসিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।
শুধু গোল করাই নয়, মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করা এবং সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও তিনি সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, মেসির এই ফর্ম যদি নকআউট পর্বেও বজায় থাকে, তবে আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয় করা অসম্ভব কিছু নয়।
ইতিহাস গড়ে অমরত্বের পথে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
পর্তুগিজ যুবরাজ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আরও একবার প্রমাণ করলেন যে, রেকর্ড বইয়ের পাতাগুলো ওলটপালট করার জন্যই তার জন্ম। প্রথম রাউন্ডের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল পর্তুগাল। আর এই ম্যাচেই বিশ্ববাসী সাক্ষী হলো এক অবিশ্বাস্য ইতিহাসের।
উজবেকিস্তানের বিপক্ষে চোখ ধাঁধানো এক জোড়া গোল (ব্রেস) করার মাধ্যমে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ইতিহাসের প্রথম এবং একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য রেকর্ড, নিজের নামে করে নিয়েছেন।
পাঁচটি বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ডটি আগে থেকেই তার দখলে ছিল, তবে ২০২৬ আসরে গোল করে তিনি নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যা হয়তো আগামী কয়েক দশকেও কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। রোনালদোর এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্স পর্তুগালকে নকআউট পর্বের আগে মানসিকভাবে বিশাল আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।
প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ত্রাস কিলিয়ান এমবাপ্পে
বর্তমান বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে গতিময় ও ভয়ংকর ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে তার চেনা ছন্দেই টুর্নামেন্ট শুরু করেছেন। ফ্রান্সের এই পোস্টার বয় প্রথম রাউন্ডের প্রথম ম্যাচ থেকেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য এক জীবন্ত আতঙ্কে পরিণত হয়েছেন।
তার অবিশ্বাস্য গতি, নিখুঁত ড্রিবলিং এবং ডি-বক্সের ভেতর যেকোনো কোণ থেকে শট নেওয়ার ক্ষমতা ফরাসিদের প্রতিটি ম্যাচে সহজ জয় এনে দিচ্ছে। নিজের নামের প্রতি শতভাগ সুবিচার করে প্রথম রাউন্ডেই তিনি তার গোলসংখ্যা বেশ বাড়িয়ে নিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমবাপ্পে যেভাবে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করছেন, তাতে গোল্ডেন বুট এবং গোল্ডেন বল উভয় পুরস্কারের জন্যই তিনি মেসির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
ইনজুরি কাটিয়ে নেইমারের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ‘পোস্টার বয়’ নেইমার জুনিয়রের জন্য বিশ্বকাপের শুরুটা বরাবরের মতোই ছিল কিছুটা ট্রাজিক। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে ইনজুরির (আঘাত) কবলে পড়ায় সেলেসাওদের হয়ে প্রথম কয়েকটি ম্যাচে মাঠে নামা সম্ভব হয়নি তার। নেইমারের অনুপস্থিতিতে ব্রাজিলের আক্রমণভাগে কিছুটা ধার কম লক্ষ্য করা যাচ্ছিল।
তবে ভক্তদের সব উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে ,স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ মঞ্চে প্রত্যাবর্তন করেন নেইমার। মাঠে ফিরেই তিনি তার সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। নেইমারের উপস্থিতি ব্রাজিলের পুরো দলের শরীরী ভাষা বদলে দিয়েছে। তার চমৎকার পাসিং এবং আক্রমণ গড়ার দক্ষতা সেলেসাওদের নকআউট পর্বের আগে এক নতুন লাইফলাইন প্রদান করেছে।
পরিসংখ্যানের আয়নায় প্রথম রাউন্ডের সেরা পারফর্মার
২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড শেষে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি। ধারাবাহিক গোল করার পাশাপাশি অ্যাসিস্টেও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে তিনি তালিকার শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন।
অন্যদিকে পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন।
এদিকে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পেও গোলদাতার তালিকায় মেসির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন। তার দুর্দান্ত গতি, ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করার সামর্থ্য এবং ধারাবাহিক গোল করার ক্ষমতা ফ্রান্সকে বড় ভরসা দিচ্ছে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ইনজুরিতে থাকার পর ব্রাজিলের নেইমার জুনিয়র স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে ফিরেছেন। তার প্রত্যাবর্তন শুধু মাঠের পারফরম্যান্সেই নয়, দলের মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছে।
এখনো পর্যন্ত আসরের সেরা কে?
বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড শেষ হওয়ার পর এখন ফুটবল বিশ্বে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এখনো পর্যন্ত এই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় কে? এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেওয়া এই মুহূর্তে কঠিন, কারণ ফুটবলাররা প্রত্যেকেই মাঠে অবিশ্বাস্য নৈপুণ্য প্রদর্শন করছেন।
তবে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান, দলের জয়ে অবদান এবং ধারাবাহিকতার বিচারে ফুটবল পণ্ডিত ও ভক্তরা দুইজনকে বাকিদের চেয়ে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রাখছেন
লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে থাকা এবং মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের নিখুঁত সমন্বয়ের কারণে তিনি সেরা খেলোয়াড়ের দৌড়ে ফ্রন্টরানার।
কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স) তার একক নৈপুণ্যে ফ্রান্সের টানা আধিপত্য তাকে এই তালিকার শীর্ষ কাতারে ধরে রেখেছে।
এছাড়াও রোনালদোর বিশ্বরেকর্ড এবং নেইমারের কামব্যাক টুর্নামেন্টের আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নকআউট পর্বের রোমাঞ্চকর ভবিষ্যতের অপেক্ষা
প্রথম রাউন্ডের এই জমজমাট লড়াই কেবলই শুরু। আসল পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে নকআউট পর্বে, যেখানে একটি ভুল মানেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়। মেসি ও রোনালদোর ক্যারিয়ারের সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ হওয়ায় এই টুর্নামেন্টটি তাদের জন্য নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার মঞ্চ।
অন্যদিকে তরুণ তুর্কি এমবাপ্পে চাইবেন তার রাজত্ব ধরে রাখতে এবং নেইমার চাইবেন ব্রাজিলের হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) মিশন সফল করতে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্ত এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এই চার মহাতারকার পরবর্তী জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখার জন্য।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন