অবিশ্বাস্য জয়ের পরও কেন রেগে গিয়েছিলেন মেসি?

স্পোর্টস ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম
অবিশ্বাস্য জয়ের পরও কেন রেগে গিয়েছিলেন মেসি?

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে এক অলৌকিক ও অবিশ্বাস্য জয়ের পরও আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসির মুখে চিরচেনা হাসি ছিল না। দল ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও দুর্দান্ত এক প্রত্যাবর্তনে ৩-২ গোলে ম্যাচ জিতেছে, নিশ্চিত করেছে কোয়ার্টার ফাইনালও। এত কিছুর পরও নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে এক বুক হতাশা লুকিয়ে রাখতে পারেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিশেষ করে ম্যাচের অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পেনাল্টি মিস করার কারণে নিজের ওপরই প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ও রাগান্বিত ছিলেন তিনি।

আটলান্টায় অনুষ্ঠিত এই নকআউট ম্যাচের শুরুটা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য মোটেও ভালো ছিল না। ম্যাচের ১৫ মিনিটেই ইয়াসির ইব্রাহিমের গোলে আকস্মিক এগিয়ে যায় মিশর। তবে পিছিয়ে পড়ার পরপরই দ্রুত সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ আসে আর্জেন্টিনার সামনে। ২১ মিনিটে পেনাল্টি পায় তারা। স্পটকিক নেওয়ার চেনা দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মেসি। কিন্তু তাঁর নেওয়া শটটি ডানদিকে চমৎকারভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে নস্যাৎ করে দেন মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর।

পেনাল্টি হাতছাড়া করার পর মাঠের ভেতরেই চরম হতাশা প্রকাশ করতে দেখা যায় মেসিকে। ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে এই ফুটবল মহাতারকা বলেন, পেনাল্টি থেকে গোল করতে না পারায় আমি নিজের ওপর খুব রাগান্বিত ও ভীষণ হতাশ ছিলাম। ওই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে যদি গোলটা করতে পারতাম, তাহলে ম্যাচের পুরো চিত্রই অন্যরকম হয়ে যেত।

তবে মেসির সেই হতাশা অবশ্য মাঠের ভেতর বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেননি তিনি নিজেই। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর আর্জেন্টিনার ঘুরে দাঁড়ানোর রূপকথা লেখা হয় এই মহানায়কের হাত ধরেই। ৭৯ মিনিটে মেসির নিখুঁত অ্যাসিস্ট (গোল সহায়তা) থেকে বল পেয়ে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো গোল করে ব্যবধান কমান। এর ঠিক চার মিনিট পর, অর্থাৎ ৮৩ মিনিটে চোখধাঁধানো এক গোল করে আলবিসেলেস্তাদের সমতায় ফেরান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। আর ম্যাচের যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজের করা গোলে ৩-২ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা।

দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলার পর মেসি বলেন, সত্যি বলতে, আমরা যেভাবে ম্যাচটা জিতেছি এবং পরের পর্বে পা রেখেছি, সেটাই সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়। ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি খুবই জটিল হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে এভাবে ম্যাচ বের করে আনাটা ছিল দারুণ রোমাঞ্চকর। আমরা আবারও মাঠে অনেক কষ্ট করেছি। তবে এটাই বিশ্বকাপ, এখানে সব দলই খুব কাছাকাছি মানের। আমি খুবই খুশি।

মেসি আরও জানান, দলের চরম বিপদের মুহূর্তে অবদান রাখতে পারাটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে স্বস্তির। তাঁর ভাষ্য, আমরা শুরু থেকেই ভালো খেলছিলাম। পেনাল্টির বাইরেও পরিষ্কার কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেছিলাম আমরা। কিন্তু তাদের গোলরক্ষক অসাধারণ কিছু সেভ করেছে। শেষ পর্যন্ত সুযোগ পেয়ে আমি গোল করতে পেরেছি। প্রথমে যা-ই ঘটুক না কেন, শেষ পর্যন্ত এই দলকে জেতাতে সাহায্য করতে পারাটা আমার জন্য খুবই বিশেষ এক অনুভূতি।

মিশরের বিপক্ষে এই ম্যাচে মেসি শুধু গোল বা অ্যাসিস্টই করেননি, পুরো আক্রমণভাগকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যদিও পেনাল্টি মিসের কারণে বিশ্বকাপে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডেও নাম উঠেছে তাঁর। টাইব্রেকার বাদে বিশ্বকাপের মূল ম্যাচে দুটি পেনাল্টি মিস করা ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এর আগে চলতি আসরের গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও স্পটকিক থেকে গোল করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া মিশরের বিপক্ষে তাঁর নেওয়া একটি দারুণ ফ্রি-কিকও পোস্টে লেগে ফিরে আসে।

তবে অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের পাশাপাশি এই ম্যাচে অনন্য কিছু কীর্তিও গড়েছেন মেসি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার পর প্রথম ফুটবলার হিসেবে একই বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করা, ৫টির বেশি সফল ড্রিবল করা এবং ওপেন প্লে থেকে ৫টির বেশি গোলের সুযোগ তৈরি করার অনবদ্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি।

মিশরের বিপক্ষে এই গোলটির মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের মোট গোলসংখ্যা ২১-এ নিয়ে গেলেন মেসি, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় তাঁর অবস্থানকে আরও মজবুত করল। একই সঙ্গে রোমেরোর গোলে অ্যাসিস্ট করায় বিশ্বকাপে তাঁর মোট অ্যাসিস্টের সংখ্যা দাঁড়াল ৯-এ, যা ছাড়িয়ে গেছে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনাকে।

চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবল জাদুকর। মিশরের বিপক্ষে গোলটি ছিল এই আসরে তাঁর অষ্টম গোল, যার মাধ্যমে তিনি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছেন। একই সঙ্গে ১৯৩০ বিশ্বকাপে গিয়ের্মো স্তাবিলের করা এক বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ ৮ গোলের ঐতিহাসিক রেকর্ডেও ভাগ বসালেন মেসি।

দলের লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করে অধিনায়ক বলেন, ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাচ জেতা সহজ ছিল না। তবে এটাই এই দলের আসল চরিত্র। আমরা কখনো হাল ছাড়ি না এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করি। আজকের এই জয় আমাদের পুরো জাতির জন্য গর্ব করার মতো একটি মুহূর্ত।

এই নাটকীয় জয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখল আর্জেন্টিনা। বাংলাদেশ সময় আগামী রবিবার কোয়ার্টার ফাইনালের হাইভোল্টেজ ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।

জেএইচআর