Amar Sangbad
ঢাকা রবিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২২, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯

ঝরে পড়া শিক্ষার্থী বাড়ছে   

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান 

জানুয়ারি ১, ২০২২, ১০:১০ এএম


ঝরে পড়া শিক্ষার্থী বাড়ছে   

২০২১ সালের ১২ অক্টোবর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়েছে। ঐ সময় থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার নিয়ে। ২০২১ সালের মে মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কোভিড-১৯ সংক্রান্ত যে কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, সেখানেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়া বাড়বে বলে ধারণা করা হয়। 

অন্যদিকে সেভ দ্য চিলড্রেন তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ‘মহামারির কারণে বিশ্বে ৯৭ লাখ শিশুর আর কোনোদিন হয়তো ক্লাসে ফেরা হবে না। যাদের অনেকেরই বাল্যবিয়ের শিকার হবে।’ তাদের এই প্রতিবেদনটি আমলে নিয়ে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) পরিচালিত এক জরিপ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘২০২০ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশের ২১টি জেলায় অন্তত ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছে। 

এই বাল্যবিয়ের ৭৮ ভাগই হয়েছে মা-বাবার আর্থিক অসচ্ছলতাকে কেন্দ্র করে। এদের প্রায় অর্ধেকের বয়স ১৬ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। আর ৪৮ ভাগের বয়স ১৩ থেকে ১৫ বছর এর মধ্যে। আর অবশিষ্ট ২ ভাগের বয়স মাত্র ১০ থেকে ১২ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।’ বর্তমান পরিস্থিতিতে মেয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়ার একটি বড় কারণ হিসেবে বাল্যবিয়েকে দায়ী করা হচ্ছে। মাঠ জরিপ সে কথারই ইঙ্গিত বহন করে। 

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন তাদের এক গবেষণায় বলছে, ‘করোনাকালে বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ৬৫টি বাল্যবিয়ে হয়েছে। এ রকম সাত মাসে ২১ জেলার ৮৪ উপজেলায় মোট ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিবাহের তথ্য তাদের হাতে রয়েছে।’ 

অন্যদিকে করোনার কারণেও অনেক ছেলে শিক্ষার্থীও শিক্ষাজীবন থেকে ঝরেপড়েছে। যার অন্যতম কারণ দারিদ্র্য। 

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) প্রকাশিত এক জরিপে বলা হয়, ‘করোনা পরিস্থিতির আগে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিলো ২০.৫ শতাংশ। কিন্তু করোনাকালে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশ। সবচে বেশি বেড়েছে অতি দারিদ্র্য মানুষের সংখ্যা। তিন গুণ বেড়ে যা এখন দাঁড়িয়েছে ২৮.৫ শতাংশে।’ যার ব্যাপক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের জীবনে। বিশেষ করে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। 

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) তার এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, ‘দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় পৌনে ৩ কোটি। আর মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। করোনা ইতোমধ্যে এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ 

দেশের কিন্ডারগার্টেন বা সমমানের বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তেমনি এর পেশায় নিয়োজিত অনেকেই পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক বেসরকারি শিক্ষকদের জীবন ও জীবিকা এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, তারা চাইলেও কখনো আর এই পেশায় ফিরে আসতে পারবে না। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধও হয়ে গেছে।  সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা জরিপ বলছে, দেশের দারিদ্র্যের হার পৌঁছেছে ২২ থেকে ৩৫ শতাংশে। 

এই পরিসংখ্যান আরও বাড়বে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। দেখা যায়, পূর্বের বছরগুলোতে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিবছর প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হবার আগে প্রায় ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে যায়। মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ হবার আগে আরও ৩৭ শতাংশ ঝরে পড়ে। যার মূল কারণ হিসেবে তখন দায়ী করা হতো দারিদ্র্যে ও বাল্যবিয়েকে। বর্তমান পরিস্থিতি সেটিকে আরো জটিল করছে, যা শিক্ষার জন্য একটি বড় ধরণের প্রতিবন্ধকতা।  

কারা বেশি ঝরে পড়ছে, কী কারণে ঝরেপড়ছে, এর কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট বয়সে গিয়ে শহরের বস্তি এলাকা, গ্রামের হতদরিদ্র, স্বল্প আয়ের মানুষ ও চর- হাওর অঞ্চলের শিশুরাই বেশি শিক্ষাজীবন থেকে ঝরেপড়ছে। এর সাথে এখন যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন পরিবার। করোনার কারণে যারা চাকরি হারিয়ে বেকার, কারো-বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ঝরেপড়ার হার স্বাভাবিক কারণেই বাড়ছে। করোনায় দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলায় অনেক অভিভাবক সন্তানকে শিশুশ্রমে নিযুক্ত করেছেন। ফলে অনেকেরই বিদ্যালয়ে ফেরার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। 

বৈশ্বিক এই প্রভাব থেকে রাতারাতি পরিত্রাণ পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যার বাস্তবতা ইতোমধ্যে লক্ষ করা গেছে। স্কুল-কলেজ খুললেও অনেক শিক্ষার্থী আর ক্লাসে ফিরে আসেনি। আদৌ তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব কি না একথা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। প্রণোদনামূলক কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে হয়তো অনেকে ফিরে আসবে।  যারা এখনো বিদ্যালয় থেকে ঝরেপড়েনি, তারা যেন কোনোভাবে ঝরে না পড়ে সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। 

শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়ার এই হার দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে যতই কালক্ষেপণ করা হবে এই সারি ততই দীর্ঘ হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষ অর্থাৎ ২০২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে যদি প্রাথমিক বা সমমানের বিদ্যালয়গুলোতে সম্মানজনক একটি বৃত্তি চালু করা যায়, তাহলে ঝরেপড়ার এই সংখ্যা অনেকটাই হ্রাস করা সম্ভব। তবে অঞ্চলভেদে এই পরিকল্পনা প্রনয়ণে বৈচিত্র্য থাকা প্রয়োজন। 

বিশেষ করে শহরের বস্তি এলাকা, দুর্গম দরিদ্র পল্লী, চর ও হাওর অঞ্চলগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। এ সমস্ত দরিদ্র এলাকার প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের একবেলা খাবারের ব্যবস্থা করার বিষয়টিও ভেবে দেখা যেতে পারে। যেহেতু এসব কাজে অপচয় হবার সম্ভাবনা থাকে, সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সহায়তামূলক বৃত্তির আর্থিক পরিমাণ বাড়িয়েও বিবেচনা করা যেতে পারে। 

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে আমভাবে বৃত্তি প্রদানের বিষয়টি চিন্তা না শিক্ষার্থীর আর্থিক অবস্থা ও পারিপাশির্^কতা বিবেচনায় নিয়ে আর্থিক প্রনোদণা ঘোষণা সবচে যৌক্তিক বলে মনে হয়। বর্তমান বাস্তবতায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা সমীচীন নয়। 

আমাদের বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে সাজাতে হবে, যাতে একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়কে তাদের আদর্শ বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে মনে করে। এর পাশাপাশি যদি বিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণ পদ্ধতি  শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, ঝরেপড়া রোধ করা কিছুটা হলেও কমবে। তারা শিক্ষাজীবন ছেড়ে যেতে চাইবে না। পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসাই তাকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখবে। 

অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে ফিরতে না-পারায় লেখাপড়া থেকে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। পড়াশোনায় আগের চেয়ে অনেক পিছিয়ে গেছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পড়াশোনার প্রতি অনীহাও তৈরি হয়েছে। এখান থেকে শিক্ষার্থীদের পরিত্রাণের জন্য শিক্ষাগ্রহণ কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী পঠিত বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে পারল কি না? আর যদি না পারে সেক্ষেত্রে অন্যভাবে ভাবতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যখন ক্লাসের পড়া বুঝে নিতে পারে, শিক্ষা গ্রহণে তার আগ্রহ জন্মায়। পরের ক্লাস সে আর কখনো মিস করতে চায় না। এবং বিদ্যালয়ে আসতেও ভোলে না। 

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বা সমমানের বিদ্যালয়গুলো ও সরকারি-বেসকারি বা সমমানের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুব একটা উল্লেখযোগ্য নয়। যদি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকে তারা শিক্ষা কার্যক্রমকে শতভাগ ফলপ্রসূ করতে পারেন।

এজন্য শিক্ষক ও প্রশাসনকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজগুলোর শ্রেণিভিত্তিক উপস্থিতির সংখ্যা খুব একটা বেশি নয়। দৃষ্টিভঙ্গির একটু পরিবর্তন করলে দেশ ও জাতির কল্যাণে ভালো কিছু উপহার দেওয়া যায়।

কিন্তু সংকীর্ণতা আমাদের একটা আষ্টেপৃষ্টে ধরে রেখেছে যে, আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। শিক্ষাকেও বাণিজ্যিক পন্যতে পরিণত করেছি। দেশের উন্নতি ও অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে শিক্ষার বিকল্প নেই। এজন্যই সরকার সবসময় শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভাবে। দেশের এই ক্রান্তিকালে শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়া রোধ করা সরকারের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক