আইনি যাঁতাকলে প্রাথমিক শিক্ষা

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: জুন ১৪, ২০২৬, ১২:১০ এএম

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখতে প্রধান শিক্ষকের পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বর্তমানে এক অভূতপূর্ব আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার বেড়াজালে পড়ে দেশের অর্ধেকেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। এই তীব্র অভিভাবকহীনতা কাটাতে সরাসরি নিয়োগ এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক পদোন্নতি- দুই পথেই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল সরকার। তবে বিধিমালা সংক্রান্ত জটিলতা এবং উচ্চ আদালতের সামপ্রতিক স্থগিতাদেশের কারণে দুটি প্রক্রিয়াই এখন সম্পূর্ণ থমকে গেছে।

জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকরা ‘ভারপ্রাপ্ত’ হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেমন পাঠদানে মনোযোগ হারাচ্ছেন, তেমনি পূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতেও হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগের জন্য মাত্র ১,১২২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন রেকর্ডসংখ্যক প্রায় সাত লাখ চাকরিপ্রার্থী। দীর্ঘ সময় পার হলেও পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা না হওয়ায় লাখ লাখ বেকারের ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চিত, তেমনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই আইনি জট খোলার ধীরগতির কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে দেশের প্রায় এক কোটি শিশুর বুনিয়াদি শিক্ষা কার্যক্রম।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অনুমোদিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৪৫৭টি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন করে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমানে অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৩৪ হাজার ১৫৯টি প্রধান শিক্ষকের পদই শূন্য। অর্থাৎ, শতকরা হিসেবে দেশের প্রায় ৫২ ভাগ বিদ্যালয়ে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।

স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় এসব বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকরা ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে দ্বিমুখী সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে— ১. অতিরিক্ত কাজের চাপ: ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের একদিকে যেমন প্রশাসনিক ফাইলপত্র, উপবৃত্তি, মিড-ডে মিল এবং সরকারি বিভিন্ন উপাত্তসংগ্রহের কাজ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদানও করতে হচ্ছে। এতে তারা কোনো কাজই শতভাগ মনোযোগ দিয়ে করতে পারছেন না। ২. সিদ্ধান্তহীনতা: ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকায় শিক্ষকরা পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক বা আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটির সাথে সমন্বয় এবং জরুরি তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের আইনি সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদের মোট শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং বাকি ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত বছর সরকার এই বিধিমালাটি চূড়ান্ত করে।

সারা দেশে হাজার হাজার যোগ্য ও অভিজ্ঞ সহকারী শিক্ষক রয়েছেন যাদের ১২ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ রয়েছে। কিন্তু একটি চলমান মামলার কারণে মন্ত্রণালয় তাদের পদোন্নতি দিতে পারছে না। ফলে পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্যপদ পূরণের যে বড় সুযোগ ছিল, তা-ও এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। শিক্ষক সংকট কাটাতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) গত বছরের ৩১ আগস্ট প্রধান শিক্ষক পদের জন্য একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। শুরুতে বিজ্ঞপ্তিতে ২,১৬৯টি পদের কথা উল্লেখ করা হলেও পরবর্তীতে বিধিমালা সংশোধনের পর পদের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক কমিয়ে ১,১২২টিতে আনা হয়।

গত বছরের অক্টোবরে এই পদের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হয়। পদসংখ্যা কমলেও বেকারত্বের বাজারে এই পদের জন্য রেকর্ডসংখ্যক প্রায় ৭ লাখ চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিটি পদের বিপরীতে গড়ে ৬২৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। পিএসসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই পরীক্ষাটি মোট ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হবে।

লিখিত পরীক্ষা: ৯০ নম্বর (পাসের জন্য ন্যূনতম ৫০% অর্থাৎ ৪৫ নম্বর পেতে হবে)। মৌখিক পরীক্ষা: ১০ নম্বর (লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরাই কেবল সুযোগ পাবেন)।

আবেদনের পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও পরীক্ষার কোনো তারিখ ঘোষণা না হওয়ায় সাত লাখ চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। অনেকেরই সরকারি চাকরির বয়সসীমা শেষের দিকে হওয়ায় তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। পরীক্ষাটি সময়মতো না হওয়ার পেছনে কেবল আইনি জটিলতাই নয়, বিশাল লজিস্টিকস এবং আর্থিক ব্যয়ের বিষয়ও জড়িয়ে রয়েছে। পিএসসি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা কেন্দ্রগুলোতে একসঙ্গে প্রায় সাত লাখ প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষা নেয়া অত্যন্ত জটিল ও চ্যালেঞ্জিং কাজ।

এই বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর প্রশ্নপত্র তৈরি, আসন বিন্যাস, পরিদর্শক নিয়োগ এবং খাতা মূল্যায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ১১ কোটি টাকার বাজেট প্রয়োজন। এই বিশাল অংকের অর্থ বরাদ্দ এবং ব্যবস্থাপনার জন্য পিএসসির দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল, যা এই স্থগিতাদেশের কারণে থমকে গেছে। চলমান এই অচলাবস্থা নিয়ে মুখ খুলেছেন পিএসসি এবং গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা। তারা উভয়ই বিষয়টিকে আদালতের এখতিয়ারভুক্ত হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত মে মাসে উচ্চ আদালত থেকে এই শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ওপর একটি ৬ মাসের স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে। এর ফলে আইনিভাবে পিএসসির হাত বাঁধা। আমরা চাইলেও এখন পরীক্ষা নিতে পারছি না। নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করতে হলে আগে আদালতের এই স্থগিতাদেশ নিষ্পত্তি বা ভ্যাকেট করতে হবে। তবে সাত লাখ প্রার্থীর পরীক্ষা নেয়ার লজিস্টিক সক্ষমতা পিএসসির রয়েছে। আইনি বাধা কাটলেই আমরা দ্রুত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করব।’

অন্যদিকে, এই সংকট নিরসনে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, ‘মূলত আদালতের একটি মামলার কারণেই পদোন্নতি এবং সরাসরি নিয়োগ উভয় প্রক্রিয়াই থমকে গেছে। আমরা আইন মন্ত্রণালয়ের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আদালতের এই মামলার নিষ্পত্তি করা যায়। মামলার জট খুললেই সরকার বড় আকারে সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেবে। দেশের প্রাথমিক শিক্ষার স্বার্থে সরকার এই সংকট সমাধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।’

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকা কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় শিক্ষাগত বিপর্যয়। সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মতে, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হলেন সেই প্রতিষ্ঠানের ‘ক্যাপ্টেন’। তিনি যদি অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত হন, তবে সহকারী শিক্ষকদের ওপর তার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা চেইন অব কমান্ড বজায় থাকে না। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সমাপনী প্রস্তুতি এবং প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিশুদের বুনিয়াদি শিক্ষার ওপর। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়কে এই মামলায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জরুরি শুনানির উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি হয় তার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভর করে। দেশের অর্ধেকের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থায়ী অভিভাবক ছাড়া চলা মানে হলো জাতির ভিত্তিমূলেই দুর্বলতা রেখে দেয়া। ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এই প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা কোনোভাবেই দীর্ঘায়িত হতে দেয়া যায় না। মে মাসে দেয়া ৬ মাসের স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে, সরকারের উচিত বিশেষ আইনি প্যানেল গঠন করে উচ্চ আদালতে দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করা। একই সাথে পিএসসিকে তাদের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ও ১১ কোটি টাকার লজিস্টিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে রাখতে হবে, যাতে আইনি সবুজ সংকেত পাওয়ামাত্রই পরীক্ষা গ্রহণ করা যায়। লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ এবং কোটি শিশুর শিক্ষার অধিকার সুরক্ষায় এই অচলাবস্থা ভাঙার এখনই সময় বলে বিশ্লেষকরা মতামত ব্যক্ত করেছেন।