জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে রাজস্ব আদায় প্রধান ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বর্তমানে দেশের রাজস্ব প্রশাসনে এক গভীর সংকট দেখা দিয়েছে। একদিকে আকাশচুম্বী লক্ষ্যমাত্রা, অন্যদিকে আদায়ে নজিরবিহীন ধীরগতি। এর ওপর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে বিচার বিভাগে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ রাজস্বের মামলা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, শুধুমাত্র উচ্চ আদালতেই আটকে আছে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ কর, যা আদায় করা সম্ভব হলে বর্তমান অর্থবছরের রেকর্ড ঘাটতি কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব হতো।
এনবিআর থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে আয়কর অনুবিভাগের মামলার বিপরীতে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার ১৬৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মূলত দেশের বড় বড় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কর সংক্রান্ত বিরোধের কারণে ঝুলে আছে।
বিশেষ করে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মাত্র ১৬টি মামলাতেই আটকে আছে ১৩ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। এনবিআরের দাবি, এই গুটিকয়েক বড় মামলা যদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, তবে চলতি অর্থবছরের শেষ সময়ে সরকারের কোষাগারে বড় ধরনের অর্থের জোগান নিশ্চিত হবে।
রাজস্ব আদায়ের এই করুণ পরিস্থিতিতে এনবিআর সমপ্রতি সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি জেনারেলকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে এনবিআর চেয়ারম্যান উল্লেখ করেছেন যে, দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে এবং বাজেট ঘাটতি মেটাতে এই আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব মামলায় বড় অংকের রাজস্ব জড়িত, সেগুলো যেন বিশেষ বেঞ্চের মাধ্যমে বা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত শুনানি করা হয়, সেই অনুরোধ জানানো হয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) রাজস্ব আদায়ের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। লক্ষ্যমাত্রা এবং অর্জনের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। ঘাটতির এক লাখ কোটি টাকা নিয়েও চলতি জুন মাসের ১১ তারিখে ওপরে। এনবিআরের ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে মোট ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। প্রথম ১০ মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। এর অর্থ হলো, মে এবং জুন- এই মাত্র দুই মাসে এনবিআরকে আরও প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। গাণিতিক হিসেবে প্রতি মাসে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা আদায় করা প্রয়োজন, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আদালতে ঝুলে থাকা মামলাগুলোর মধ্যে ১৪টি বড় প্রতিষ্ঠান এবং দুজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। যাদের মাধ্যমে ১৩ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার ও ইউনাইটেড এনার্জি, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও সোনালী ব্যাংক, বেসরকারি খাতের এক্সিম ব্যাংক ও নির্মাণ খাতের তমা কনস্ট্রাকশন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এনবিআরের মামলা এবং সেই অর্থ আটকে থাকা প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতারই বহিঃপ্রকাশ।
এক সরকারি সংস্থা অন্য সংস্থার বিরুদ্ধে আদালতে লড়ছে, যার ফলে দিনশেষে সরকারেরই লোকসান হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব মামলাগুলো দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- ১. আইনি জটিলতা: কর আইনের ধারাগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা এবং উচ্চ আদালতে দীর্ঘ শুনানি প্রক্রিয়া। ২. দক্ষ আইনজীবীর অভাব: এনবিআরের পক্ষে লড়ার জন্য বিশেষায়িত কর আইনজীবীর স্বল্পতা। ৩. আদেশ স্থগিত: বড় করদাতারা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে বছরের পর বছর কর পরিশোধ থেকে বিরত থাকছেন। ৪. বিচারক সংকট: উচ্চ আদালতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বেঞ্চ না থাকায় নিয়মিত মামলার চাপে রাজস্ব মামলাগুলো অগ্রাধিকার পাচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদ ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকলে সরকারকে ব্যাংক ঋণ নিতে হয়, যা মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। এনবিআর যদি এই ৩৫ হাজার কোটি টাকা উদ্ধারে সফল হয়, তবে ব্যাংক ঋণের ওপর চাপ কমবে।’ অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, অল্টারনেটিভ ডিসপিউট রেজোলিউশন (এডিআর) বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতির ওপর আরও জোর দেয়া উচিত। আদালতের বাইরে আলোচনার মাধ্যমে কর আদায় করা গেলে সময় ও অর্থ উভয়ই সাশ্রয় হবে।
পরিশেষে বলা যায়, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ আদালতের বারান্দায় আটকে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এনবিআরের পক্ষ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলকে দেয়া চিঠির কার্যকর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। যদি চলতি জুন মাসের মধ্যে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন বড় মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হয়, তবে অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের (১১ জুন উত্থাপিত) জাতীয় বাজেটে এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে।