বাংলাদেশের স্থানীয় শাসন কাঠামো এবং তৃণমূল স্তরের নির্বাচনি রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক ও আমূল পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একে অন্যতম একটি বড় ও যুগান্তকারী আইনি সংস্কার পরিকল্পনা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নেয়া মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করার এক বিশাল মহাযজ্ঞ হাতে নেয়া হয়েছে। এর আওতায় রয়েছে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, গ্রামীণ ও শহরতলীর উপজেলা পরিষদ এবং প্রধান প্রধান বিভাগীয় শহরের সিটি কর্পোরেশন।
তবে এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় এবং চমকপ্রদ দিকটি হলো- এবারের সব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সম্পূর্ণ নির্দলীয় আবহে, অর্থাৎ কোনো রাজনৈতিক দলীয় প্রতীক বা ব্যানার ছাড়াই। এর মাধ্যমে বিগত এক দশক ধরে চলা দলীয় প্রতীকের স্থানীয় নির্বাচন ব্যবস্থার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। কমিশনের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই সিদ্ধান্তকে তাদের সামগ্রিক নির্বাচনি রোডম্যাপের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের সব স্থানীয় নির্বাচন সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে শেষ করাই এখন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য। একই সময়ে দেশের মাঠ প্রশাসনকে দিকনির্দেশনা দিতে গিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীও জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে একই প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, যা এই মহা-উদ্যোগের পেছনে সরকারের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার গভীর সমন্বয়কে নির্দেশ করে।
অতীতের প্রশাসনিক ও নির্বাচনি অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও জনসংখ্যার বিশালত্বের কারণে সারা দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভোটগ্রহণ শেষ করতে সাধারণত ১০ মাস থেকে প্রায় এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। যেহেতু এই নির্বাচনগুলো দেশের সামগ্রিক লাগবে লজিস্টিক সাপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে আয়োজন করতে হয়, সেহেতু পুরো প্রক্রিয়াটিকে নিখুঁত ও সফল করতে অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও বহুমুখী প্রশাসনিক সমন্বয়ের প্রয়োজন পড়ে।
নির্বাচন কমিশন কেবল নিজেদের চার দেয়ালের ভেতরের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে এই নতুন বিধিমালা চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে না। অতীতের নির্বাচনি বিতর্কগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান ইসি একটি সর্বজনগ্রাহ্য, স্বচ্ছ ও সম্পূর্ণ বিতর্কহীন নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এই লক্ষ্যে তারা দেশের প্রধান প্রধান নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক লিখিত মতামত, দেশের সুশীল সমাজ ও সাধারণ নাগরিকদের গঠনমূলক পরামর্শ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে সব পক্ষের সংশোধনী প্রস্তাব ও সুপারিশমালা গ্রহণের একটি ব্যাপকভিত্তিক উন্মুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এই খসড়া বিধিমালা প্রাতিষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য খুব শিগগিরই একটি বিশেষ কমিশন সভা আহ্বান করা হবে। উক্ত সভায় কমিশনারদের বিস্তারিত আলোচনার পর খসড়াটিচূড়ান্ত অনুমোদন পেলে তা তাৎক্ষণিকভাবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইনি যাচাই বা ভেটিং-এর জন্য পাঠানো হবে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক ও তৃণমূলের প্রতিষ্ঠান ‘ইউনিয়ন পরিষদ’-এর জন্য যে নতুন আচরণবিধি তৈরি করা হচ্ছে, সেটিকে মূল আইনি কাঠামো বা ব্লু-প্রিন্ট হিসেবে ধরা হবে। পরবর্তীতে এই কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশনের মতো অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালা ও আইনি ধারাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হবে। এই সামগ্রিক আইনি ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শেষ করতে আনুমানিক তিন থেকে চার মাস সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্দলীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায়, স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি বড় আশঙ্কা থাকে। যে কোনো ব্যক্তিই যাতে হুট করে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে নির্বাচনি পরিবেশ বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে না পারে এবং নির্বাচনে যাতে কেবল প্রকৃত জনবান্ধব ও যোগ্য প্রার্থীরাই অংশ নেন, তা নিশ্চিত করতে কমিশন বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপের কথা ভাবছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান ও আলোচিত বিষয় হলো- প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত জামানতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দেয়া।
নির্বাচন কমিশনের মূল এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোকে অবাধ, সুষ্ঠু, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানের স্তরে উন্নীত করা। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার সর্বোচ্চ মানদণ্ড বজায় রাখা হবে। এর জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, আইনি কঠোরতা এবং সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই কড়া নজরদারির কারণে ভোটে অবৈধ পেশিশক্তি এবং কালো টাকার রাজনৈতিক দাপট ও প্রভাব অনেকাংশে কমে যাবে।
জনগণ কোনো ভয়ভীতি ছাড়া তাদের পছন্দের স্থানীয় নেতৃত্ব বেছে নেয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা পাবেন, যা দেশের তৃণমূল গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করবে। আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে এই সুবিশাল নির্বাচনি মহাযজ্ঞের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন এবং তফসিল ঘোষণার বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যকার আনুষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক যোগাযোগের ওপর। দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, যে কোনো নির্বাচনের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারিত হওয়ার অন্তত ৪৫ দিন আগে নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা করতে হয়। আর এই তফসিল ঘোষণার পুরো প্রক্রিয়াটি শুরু করার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে ইসিতে একটি আনুষ্ঠানিক চাহিদাপত্র বা চিঠির প্রয়োজন পড়ে।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতোপূর্বে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, আগামী অক্টোবর মাস থেকে এই নির্বাচন প্রক্রিয়া মাঠপর্যায়ে শুরু হতে পারে। পরিশেষে বলা যায়, নির্বাচন কমিশনের এই সুবিশাল ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং তৃণমূল স্তরের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নতুন ও সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সম্পূর্ণ নির্দলীয় করার মাধ্যমে স্থানীয় রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর অতিরিক্ত কোন্দল, হানাহানি এবং পেশিশক্তির অবাঞ্ছিত প্রভাব অনেকাংশে হ্রাস পাবে। এর ফলে স্থানীয় সাধারণ জনগণ কোনো রাজনৈতিক চাপের মুখে না পড়ে, কেবল প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, সততা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে তাদের প্রকৃত প্রতিনিধি বেছে নেয়ার এক অভাবনীয় ও স্বাধীন সুযোগ পাবেন।