বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের অন্যতম মাইলফলক হিসেবে পরিচিত ‘সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি’ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। কর্মসূচিটি চালুর শুরুর দিকে সাধারণ মানুষের মাঝে যে বিপুল আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখা গিয়েছিল, সময়ের ব্যবধানে তা এখন অনেকটা ম্লান হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে গত এক বছরে নতুন নিবন্ধনের সংখ্যা মাত্র চার হাজারের কোটায় নেমে আসায় নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। তবে এই স্থবিরতা কাটাতে নতুন নেতৃত্ব এবং আধুনিক কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।
সামপ্রতিক হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে মোট নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৯ জন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জমানো মোট চাঁদার পরিমাণ ২৬৩ কোটি টাকার কিছু বেশি। বিপরীতে, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ দক্ষতার পরিচয় দিয়ে সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও বিলে ২৮৬ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে। মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগ করার ফলে সেই বিনিয়োগের বর্তমান বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮৮ কোটি টাকায়।
স্কিমভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে নিম্নবিত্ত মানুষের আগ্রহের জায়গাটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। সমতা স্কিম: দরিদ্র মানুষের জন্য নির্ধারিত এই স্কিমে নিবন্ধন করেছেন ২ লাখ ৮৬ হাজারের বেশি মানুষ, যা মোট নিবন্ধনকারীর ৭৬ শতাংশ। এখানে মাসিক ১০০০ টাকা চাঁদার মধ্যে ৫০০ টাকা সরকার বহন করে।
সুরক্ষা স্কিম: কৃষক, শ্রমিক ও রিকশাচালকসহ অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য এই স্কিমে প্রায় ৬৫ হাজার জন যুক্ত হয়েছেন, যেখানে জমার পরিমাণ প্রায় ৭৫ কোটি টাকা। প্রগতি স্কিম: বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য চালু এই স্কিমে প্রায় ২৫ হাজার জন নিবন্ধন করেছেন এবং তাদের জমার পরিমাণ ১২২ কোটি টাকার বেশি। প্রবাস স্কিম: বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের জন্য এই স্কিমটি থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১ হাজারের বেশি মানুষ এতে নিবন্ধন করেছেন, যার জমার পরিমাণ ৭ কোটি টাকা।
পেনশন কর্মসূচির এই মন্থর গতির পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে এই কার্যক্রমে। সরকারের ধারাবাহিকতা নিয়ে মানুষের মাঝে তৈরি হওয়া সংশয় এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রচারণার ঘাটতি নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে অনেকটাই থমকে দিয়েছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছিল যে, সরকার বদল হলে বা সময় গড়ালে এই পেনশনের টাকা আদৌ পাওয়া যাবে কি না। এই আস্থার সংকট দূর করাই এখন নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে সমপ্রতি জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ড. মো. সুরাতুজ্জামান এবং সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছেন শেখ কামরুল হাসান। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তারা এই কর্মসূচিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।এর মধ্যে রয়েছে—
১. শেয়ারভিত্তিক পেনশন স্কিম: বিনিয়োগের বৈচিত্র্য আনতে এবং গ্রাহকদের মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যে শেয়ারভিত্তিক স্কিম চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২. মনোনীত ব্যক্তির আজীবন সুবিধা: গ্রাহকের মৃত্যুর পর তার মনোনীত ব্যক্তি যাতে আজীবন পেনশন সুবিধা পান, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে। ৩. আউটসোর্সিং কর্মীদের অন্তর্ভুক্তি: সরকারি ও বেসরকারি খাতের আউটসোর্সিং কর্মীদের এই কর্মসূচির আওতায় আনার বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ৪. ব্যাংকিং খাতের সম্পৃক্ততা: গত ৩ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সব ব্যাংকের শাখায় ‘পেনশন ডেস্ক’ স্থাপন এবং বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘প্রগতি স্কিমে’ অন্তর্ভুক্ত করার কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ৫. ইসলামিক পেনশন সংস্করণ: বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের কথা মাথায় রেখে ইসলামিক শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর বিষয়েও জোরালো আলোচনা চলছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান জানান, দেশে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ বেসরকারি শ্রমিক ও কর্মচারী রয়েছেন, যারা অবসরের পর কোনো ধরনের আর্থিক সুরক্ষা পান না। তাদের এই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া যায় না। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে এই সর্বজনীন পেনশনের আওতায় নিয়ে আসা। এই লক্ষ্য অর্জনে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে কর্মশালা, সেমিনার এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
সর্বজনীন পেনশন স্কিম বর্তমান সময়ে কিছুটা স্থবিরতার মুখে থাকলেও এটি অকার্যকর হয়ে যায়নি। বরং নতুন নেতৃত্ব ও সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, এই ব্যবস্থাকে টেকসই করার সদিচ্ছার অভাব নেই। তবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের কার্যকর অংশগ্রহণের ওপর। যদি মাঠপর্যায়ে প্রচারণা জোরদার করা যায় এবং মানুষের মনে জমে থাকা আস্থার সংকট দূর করা সম্ভব হয়, তবেই সর্বজনীন পেনশন বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোতে একটি শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। সময় এখন নতুন উদ্যমে কাজ করার, যাতে পেনশনের সুফল প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারে।