আদালতের সীমাবদ্ধতায় বাড়ছে বিচারহীনতা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুন ২২, ২০২৬, ১২:৫৩ এএম

বাংলাদেশের পরিবেশগত বিপর্যয় এখন আর কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা বা কেবলই তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং এটি দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রতিদিনের এক নির্মম এবং নিষ্ঠুর বাস্তবতা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চল পর্যন্ত আজ বিষাক্ত বাতাস, দূষিত ও বুড়িগঙ্গার মতো মৃতপ্রায় নদী, অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা আর নিষিদ্ধ পলিথিনের অবাধ ব্যবহার জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। অথচ, এই বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের বিপরীতে দেশের পরিবেশ আদালতগুলো পার করছে এক অদ্ভুত ও রহস্যময় নীরবতা।

বৈশ্বিক এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স ২০২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম যা পরিবেশ সুরক্ষায় দেশের চরম ব্যর্থতার এক বৈশ্বিক দলিল। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের বিশেষায়িত পরিবেশ আদালতগুলোতে মামলার সংখ্যা অবিশ্বাস্য রকম কম। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও পরিবেশ আইন লঙ্ঘন হলেও বিচারিক খতিয়ানে তার কোনো প্রতিফলন নেই। মূলত আইনগত সীমাবদ্ধতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং আদালতের তীব্র সংকটের কারণে এই বিশেষায়িত আইনি ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য কার্যত অকার্যকর ও অচল হয়ে পড়েছে।

ঢাকার মূল পরিবেশ আদালতের বর্তমান পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই বিচারিক স্থবিরতার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আদালতটিতে বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে আট হাজারেরও বেশি মামলা। আপাতদৃষ্টিতে এই সংখ্যাটিকে বিশাল মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক বড় ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। এই আট হাজার মামলার মধ্যে প্রকৃত পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতাধীন আসল মামলা মাত্র ১৩২টি। অর্থাৎ, আদালতের প্রায় ৯৮ শতাংশ মামলাই অন্য সাধারণ বা পরিবেশ-বহির্ভূত অপরাধ সংক্রান্ত, যা এই বিশেষায়িত আদালতের মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিগত দুই বছরে এই আদালতে নতুন করে যুক্ত হওয়া পরিবেশ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা এক অঙ্কের ঘরও পার করতে পারেনি। গত দুই দশকে দায়ের হওয়া মামলার এই নগণ্য সংখ্যা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, দেশে পরিবেশ ধ্বংসের গতি যত দ্রুত, অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর বিচারিক প্রক্রিয়া ততটাই ধীর এবং স্থবির। নিম্ন আদালতের পাশাপাশি উচ্চতর আপিল আদালতেও একই হতাশার চিত্র দৃশ্যমান; সেখানেও পরিবেশ সংক্রান্ত আপিল মামলাগুলো বছরের পর বছর ধরে এক অঙ্কের কোটাতেই আটকে আছে।

আইন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীদের মতে, পরিবেশ আদালতের এই নজিরবিহীন বিচারিক খরার মূল কারণ লুকিয়ে আছে ২০১০ সালের পরিবেশ আদালত আইনের কাঠামোগত ত্রুটির মধ্যে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, দেশের কোনো সাধারণ নাগরিক বা পরিবেশ দূষণের শিকার হওয়া ভুক্তভোগী ব্যক্তি সরাসরি আদালতে গিয়ে মামলা দায়ের করতে পারেন না।

বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার জন্য প্রথমে তাকে পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা দিতে হয়। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তরের নিজস্ব কর্মকর্তা দ্বারা তদন্ত সম্পন্ন হতে হয় এবং তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর তবেই আদালত কোনো মামলা গ্রহণ করতে পারে। এই বাধ্যতামূলক এবং জটিল প্রশাসনিক ফিল্টার সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার পথকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দিয়েছে।

আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, জনবল সংকট এবং তদন্তের শ্লথগতির কারণে অনেক সময় অপরাধের তাৎক্ষণিক আলামত (যেমন ক্ষণস্থায়ী বায়ু বা শব্দদূষণ, ক্ষতিকর তরল বর্জ্য অপসারণ ইত্যাদি) নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ভুক্তভোগী মানুষ ন্যায়বিচারের আশা ছেড়ে দিয়ে মাঝপথেই লড়াই থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।

নিয়মিত পরিবেশ মামলার এই তীব্র সংকটের পেছনে পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত’ নির্ভরতাকেও অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিভিন্ন অবৈধ প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা কিংবা ইটভাটায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে সাময়িক জরিমানা আদায় করাকেই অধিদপ্তর তাদের বড় সাফল্য মনে করে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের ‘স্পট ফাইন’ বা তাৎক্ষণিক জরিমানা কেবল সাময়িক স্বস্তি বা আংশিক সমাধান দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোনো স্থায়ী ভীতি বা নজির তৈরি করতে পারছে না। অপরাধীরা জরিমানা দিয়ে পুনরায় একই দূষণমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে। দীর্ঘমেয়াদি বড় অপরাধ ঠেকাতে নিয়মিত দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার কোনো বিকল্প নেই। আদালতের স্থায়ী রায় ভবিষ্যতের জন্য আইনি নজির তৈরি করে এবং বড় বড় শিল্পগ্রুপ ও অপরাধীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবজনকভাবে, পরিবেশ আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোতে কারাদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির নজির বললেই চলে।

জনসংখ্যার অনুপাতে আদালতের সংখ্যার চরম অপ্রতুলতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ১৮ কোটির এই জনবহুল দেশে বর্তমানে মাত্র তিনটি পরিবেশ আদালত রয়েছে যা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে অবস্থিত। অথচ বর্তমান বাস্তবতায় পরিবেশগত অপরাধ এখন আর কেবল বিভাগীয় শহর বা শিল্পাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই; এটি গ্রামীণ ও জেলা পর্যায়েও আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন সাধারণ বা দরিদ্র মানুষের পক্ষে শত মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বিভাগীয় শহরে এসে বছরের পর বছর মামলা পরিচালনা করা অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে প্রায় অসম্ভব। এর ওপর যুক্ত হয়েছে পরিবেশ আইন বিষয়ে দক্ষ ও বিশেষায়িত আইনজীবীর তীব্র অভাব।

পরিবেশবিজ্ঞানী, মানবাধিকার কর্মী ও আইনবিদদের মতে, এই বিচারিক অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমূল সংস্কারের বিকল্প নেই। যেমন—

আইন সংশোধন: সবার আগে ২০১০ সালের আইন সংশোধন করে পরিবেশ আদালতকে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করতে হবে। সাধারণ নাগরিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোকে সরাসরি মামলা করার আইনি অধিকার দিতে হবে। আদালত সমপ্রসারণ: দেশের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে বিশেষায়িত পরিবেশ আদালত স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। পরিবেশ ক্যাডার গঠন: বিসিএস ক্যাডারে একটি স্বতন্ত্র ‘পরিবেশ ক্যাডার’ চালু করা প্রয়োজন। প্রতিটি উপজেলায় নির্দিষ্ট পরিবেশ কর্মকর্তা থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধ দ্রুত শনাক্তকরণ, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ এবং মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সহজ হবে।

পরিবেশ রক্ষা কেবল কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের দাপ্তরিক বা রুটিন কাজ নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার এবং সাংবিধানিক অঙ্গীকার। বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের যুগে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যদি তার পরিবেশ আদালতগুলোকে কার্যকর করতে না পারে, তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশ এক বসবাসের অযোগ্য বদ্বীপে পরিণত হবে। সরকার যদি ভুক্তভোগীদের সরাসরি মামলা করার সুযোগ দিয়ে দ্রুত আইন সংশোধনের প্রস্তাব বিবেচনা ও বাস্তবায়ন না করে, তবে একদিকে দূষণের মাত্রা জ্যামিতিক হারে বাড়তেই থাকবে, অন্যদিকে দেশের পরিবেশ আদালতগুলো চিরকালের জন্য কার্যত শূন্য এবং কার্যকারিতাহীন হয়েই থেকে যাবে। সময় এখনই কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়ার।