জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কোনো সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়; এটি রোগ নিরাময় এবং মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকারের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। তবে বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থায় করপোরেট আগ্রাসন এবং নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণে এই পরম প্রয়োজনীয় উপকরণটি ক্রমান্বয়ে সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতামূলক ও আগ্রাসী বিপণন কৌশল চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন লেখার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।
রোগীর প্রকৃত প্রয়োজনকে পাশে ঠেলে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দেয়া দামি উপহার, গাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা নগদ অর্থের প্রলোভনে পড়ে অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল ব্র্যান্ডের ওষুধ লেখার এক অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই বাণিজ্যিকীকরণের চূড়ান্ত মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ ভুক্তভোগী রোগীদের। হাসপাতাল এবং ব্যক্তিগত চেম্বারগুলোর সামনে প্রতিদিন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন কেড়ে নিয়ে ছবি তোলার যে দৃষ্টিকটু মহোৎসব চলে, তা কেবল রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তাই লঙ্ঘন করছে না, বরং একটি অনৈতিক নজরদারি ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরাই রোগীর প্রেসক্রিপশনে অতিরিক্ত ওষুধ যোগ করে দেয়ার মতো ভয়ংকর স্পর্ধাও দেখাচ্ছেন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, দেশের বিদ্যমান ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন ২০২৩’ এই তীব্র নৈতিক স্খলন ও আগ্রাসী বিপণন পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ নখদন্তহীন। আইনি সীমাবদ্ধতার দোহাই দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরও এই বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
ওষুধের উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আইনি কড়াকড়ি থাকলেও, বিপণন বা মার্কেটিংয়ের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক জাতীয় নীতিমালা নেই। চিকিৎসাসেবা ও ব্যবসার এই অনৈতিক সমীকরণ দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যকে এক গভীর কাঠামোগত সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, ওষুধের এই অনৈতিক ‘পণ্যকরণ’ বন্ধ করে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি শক্ত আইনি ও নৈতিক বিপণন কাঠামো তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
সরেজমিনে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে বিভিন্ন নামি-দামি ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ বা প্রতিনিধিদের একচ্ছত্র আধিপত্য। বহির্বিভাগের সামনে এক মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ ইব্রাহিমের কার্যক্রম দেখলে যে কারোরই মনে হতে পারে তিনি হাসপাতালেরই কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কোনো চিকিৎসক যদি তার কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রিপশনে না লেখেন, তবে তিনি বাইরে এসে রোগীর হাত থেকে প্রেসক্রিপশনটি চেয়ে নেন এবং সেখানে নিজেই নিজ কোম্পানির ওষুধ যুক্ত করে দেন। চিকিৎসক না হওয়া সত্ত্বেও রোগীকে বিভ্রান্ত করে প্রেসক্রিপশনে অতিরিক্ত পাঁচ থেকে ছয়টি ওষুধ লিখে রোগীর হাতে তুলে দেয়ার মতো ভয়ংকর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ প্রসঙ্গে প্রতিনিধি ইব্রাহিম নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘ভাই, কোম্পানির টার্গেট ও চাপের কারণেই আমাদের এমন কাজ করতে হয়। শুধু আমার প্রতিষ্ঠান নয়, বাজারে থাকা প্রায় সব ওষুধ কোম্পানিই আমাদের মতো প্রতিনিধিদের কাছ থেকে দৈনিক প্রেসক্রিপশনের তথ্য ও কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত কড়া জবাবদিহি চায়। টার্গেট পূরণ না হলে চাকরি টেকানো দায়।’
হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের চেম্বারের সামনে এখন প্রতিদিন এক চেনা চিত্র দেখা যায় রোগী চেম্বার থেকে বের হওয়া মাত্রই মৌমাছির মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিরা। রোগীর অনুমতি ছাড়াই প্রেসক্রিপশন কেড়ে নেয়া হয় এবং কোন কোম্পানির ওষুধ লেখা হয়েছে তার প্রমাণ রাখতে মুঠোফোনে ছবি তোলা হয়। কিন্তু চিকিৎসকরা কেন নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ লিখতে বাধ্য হন? আমার সংবাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ বেশি পরিমাণে লেখার বিনিময়ে কিছু চিকিৎসককে দামি মোবাইল ফোন, গাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা মোটা অঙ্কের নগদ অর্থ প্রদান করা হয়।
আর এই গিফট বা উপহার দেয়ার পর কোম্পানিগুলো প্রেসক্রিপশন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে যে তাদের ‘বিনিয়োগ’ উসুল হচ্ছে কি না। ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, কোনো চিকিৎসক যদি একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ওষুধ এক বা দুই সপ্তাহ নিয়মিত লিখতে শুরু করেন, তবে সেটি পরে তার অভ্যাসে পরিণত হয়। এ কারণেই কোম্পানিগুলো বিভিন্ন অনৈতিক উপায়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে মরিয়া থাকে। তবে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ আংশিক অস্বীকার করা হয়েছে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শরিয়াতুল্লাহ বলেন, ‘উপহার বা গিফট আদান-প্রদানের ঘটনা বাজারে থাকলেও তার বিনিময়ে আমরা ভুল বা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লিখি না। আমরা সবসময় রোগীর স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেই। আর কোনো কোম্পানি কীভাবে তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে, সেটি সম্পূর্ণ ওই কোম্পানির নিজস্ব বিষয়।’
ওষুধ কোম্পানিগুলোর এমন আগ্রাসী ও অবৈজ্ঞানিক বিপণন কৌশল সম্পর্কে জানতে ওষুধ শিল্প সমিতির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রেসক্রিপশন পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসকদের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বিষয়ে দেশের নামকরা এক ফার্মার মেডিকেল সার্ভিস বিভাগের ম্যানেজার আহমদ শাফি হাসান বান্না দায় চাপিয়েছেন মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর।
তিনি বলেন, ‘এটি মূলত কিছু প্রতিনিধির ব্যক্তিগত অতিউৎসাহের ফল। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন পরিবর্তন বা অতিরিক্ত ওষুধ লেখার কোনো নির্দেশনা দেয়া হয় না। কোনো প্রতিনিধি হয়তো চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বলতে পারেন যে তিনি কয়েকটি প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলেছেন কিন্তু সেখানে তার কোম্পানির ওষুধ দেখেননি, সে ক্ষেত্রে প্রতিনিধি ব্যক্তিগত স্তরে অনুরোধ করতে পারেন। তবে প্রতিষ্ঠান কখনোই এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে না এবং প্রেসক্রিপশনের এসব ছবি প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে কোনো গুরুত্ব বহন করে না।’
দেশীয় ওষুধের বাজার ও বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন ২০২৩’ প্রণয়ন করলেও তা এই অনৈতিক বিপণন ঠেকাতে কার্যত নখদন্তহীন বাঘে পরিণত হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর স্পষ্ট জানিয়েছে, আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে তারা এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. আকতার হোসেন এই সংকটের কথা স্বীকার করে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অনৈতিক বিপণন কৌশলের মাধ্যমে অনেক সময় মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা চিকিৎসকদের অতিরিক্ত ওষুধ লিখতে প্রভাবিত করেন, যা সাধারণ রোগীর পকেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তাদের এই বিপণন পদ্ধতির কিছু বিষয় সামাজিক ও পেশাগতভাবে অত্যন্ত দৃষ্টিকটু হলেও, আমাদের বিদ্যমান আইনে সরাসরি এই মার্কেটিং বা বিপণন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ কিংবা তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিভঙ্গিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট ধারা বা সুযোগ নেই।’
আইনটিতে ওষুধ উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ ও বিক্রির ওপর জোর দেয়া হলেও, ওষুধ কোম্পানিগুলো চিকিৎসকদের কী উপহার দিতে পারবে আর কী পারবে না, কিংবা হাসপাতালের ভেতরে প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলা যাবে কি না এসব বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রাখা হয়নি।
জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কোনো সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয় যে তা আগ্রাসী বিপণন ও উপহারের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাজারে প্রসার বাড়াতে হবে। চিকিৎসকদের উপহারের ফাঁদে ফেলে রোগীর ওপর অপ্রয়োজনীয় ওষুধের বোঝা চাপিয়ে দেয়া এবং হাসপাতালের ভেতর প্রেসক্রিপশন নিয়ে টানাটানি করা শুধু অনৈতিকই নয়; বরং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
এই মরণঘাতী প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হলে কেবল ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন ২০২৩’-এর ওপর ভরসা করে থাকলে চলবে না; বরং অবিলম্বে একটি শক্ত ও নৈতিক ‘ওষুধ বিপণন নীতিমালা’ প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে বহিরাগত প্রতিনিধিদের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে স্বাস্থ্য খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।