প্রাথমিকে বদলি, নতুন উদ্বেগ

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ১২:৩২ এএম

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটাতে নতুন করে ‘চার স্তরের কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। আপাতদৃষ্টিতে এই পদক্ষেপকে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং কাজের গতি বাড়ানোর একটি আধুনিক উদ্যোগ হিসেবে দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় এটি সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তৈরি করেছে। নতুন এই নীতিমালার ঘোষণার পর থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা খাতে নেমে এসেছে এক গভীর উদ্বেগের ছায়া, যা এখন টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট, গবেষক এবং শিক্ষক সংগঠনগুলোর একাংশের মতে, অনলাইন বা ডিজিটাল বদলি ব্যবস্থার মাধ্যমে যেখানে মানবিক হস্তক্ষেপ ও অনিয়ম কমিয়ে আনার একটা পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল, সেখানে চার স্তরের এই নতুন কমিটি গঠন উল্টো দুর্নীতির পথকে আরও প্রশস্ত করতে পারে। তাদের বড় আশঙ্কা, স্তরে স্তরে এই কমিটির কারণে বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা কমবে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, আমলাতান্ত্রিক টেবিল-কূটনীতি ও অবৈধ তদবিরের সংস্কৃতি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।

একজন সাধারণ শিক্ষককে এখন একটি কাঙ্ক্ষিত বদলির জন্য চার-চারটি ভিন্ন স্তরের প্রশাসনিক কমিটির ছাড়পত্রের মুখোমুখি হতে হবে, যা তাদের জন্য মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানির কারণ হতে পারে।

বিশেষ করে প্রান্তিক অঞ্চলের নারী শিক্ষকরা এই নতুন নিয়মে সবচেয়ে বেশি বৈষম্য ও ভোগান্তির শিকার হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেখানে মেধা, জ্যেষ্ঠতা এবং প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলি হওয়ার কথা, সেখানে কমিটির সদস্যদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কিংবা অদৃশ্যআর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হওয়া মোটেও অসম্ভব নয়। ফলে, সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের পেশাগত সন্তুষ্টি নিশ্চিত করার এই স্পর্শকাতর প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত নতুন এক সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে কি না- তা নিয়েই এখন চারদিকে তৈরি হয়েছে তীব্র উদ্বেগ ও সংশয়।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গত ২১ জুন জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়াটি এখন চার স্তরে বিভক্ত হবে। ১. উপজেলা বা থানা কমিটি: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এর নেতৃত্বে গঠিত। ২. জেলা কমিটি: জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নেতৃত্বে গঠিত। ৩. বিভাগীয় কমিটি: বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত। ৪. জাতীয় কমিটি: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিবের নেতৃত্বে গঠিত।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলোতে সভাপতি কর্তৃক মনোনীত দুজন করে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ সদস্য হিসেবে থাকবেন। আন্তঃবিভাগ বা আন্তঃসিটি কর্পোরেশনের বদলির আবেদন নিষ্পত্তি করবে জাতীয় কমিটি। এছাড়া, নতুন নিয়োগ পাওয়া সহকারী শিক্ষকদের বিদ্যালয়ের পদায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জেলা কমিটিকে।

শিক্ষক বদলি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং প্রশাসনিক বিষয়। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন করাই নিয়ম। অথচ সেখানে রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে প্রভাবশালী ‘গণ্যমান্য’ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করাটা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বদলিপ্রক্রিয়ায় বাইরের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার অর্থই হলো তদবিরের সুযোগ করে দেয়া। ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’র কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবেই ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের বদলির ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক তদবির বেশি প্রাধান্য পাবে।

ডিজিটাল ব্যবস্থা থেকে পশ্চাৎপদতা: শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব যেখানে প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মরিয়া, সেখানে সরকার কেন অনলাইন সফটওয়্যারের সহজ ও স্বচ্ছ পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে কমিটির ওপর নির্ভরশীল সনাতন পদ্ধতিতে ফিরে যাচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। অনলাইন বদলি ব্যবস্থায় চাকরির মেয়াদ, দুর্গম এলাকায় কর্মকাল, নিজ বাড়ি থেকে দূরত্বের মতো সূচকগুলো সফটওয়্যারের মাধ্যমে নির্ধারিত থাকে, যেখানে মানবিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ ন্যূনতম।

২০২৩ ও ২০২৬ সালের ‘সমন্বিত অনলাইন বদলি নির্দেশিকা’ অনুযায়ী, শিক্ষকরা অনলাইনের মাধ্যমেই তাদের বদলি ও পদায়নের আবেদন করতে পারতেন। মাঠপর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের অনুমোদনে স্বচ্ছভাবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সাধারণ বদলি বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষক চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। এখন সেই ভোগান্তি দূর করার নামে যে কমিটিভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা হলো, তা উল্টো নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এই বিষয়টিকে ‘সাময়িক ব্যবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, শিক্ষক বদলির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে এবং সেই নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই কমিটিগুলো দায়িত্ব পালন করবে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৬৫ হাজার বিদ্যালয়ে পৌনে চার লাখ শিক্ষক এবং এক কোটি ৬ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাকার্যক্রম সরাসরি প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষক বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে শিক্ষাব্যবস্থায়।

অতীতে অনলাইন পদ্ধতির মাধ্যমে যেটুকু স্বচ্ছতা অর্জিত হয়েছিল, তাকে এগিয়ে না নিয়ে ব্যক্তিনির্ভর কমিটির দিকে ফিরে যাওয়া শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সরকার খুব দ্রুত একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং প্রভাবমুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন করবে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক বা অহেতুক প্রভাবের সুযোগ থাকবে না।