দেশের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং ঝামেলাহীনভাবে পৌঁছে দিতে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ সেবাসহ নাগরিক জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে এখন চলছে দ্রুতগতির ডিজিটাল রূপান্তর। জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ এবং বিভিন্ন খাতভিত্তিক সরকারি কর্মপরিকল্পনায় এই রূপান্তরের একটি সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
এর মূল লক্ষ্য হলো কাগজপত্রের জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে নাগরিকরা যেন ঘরে বা কর্মস্থলে বসেই সব সেবা পেতে পারেন। সম্প্রতি বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারের এই যুগান্তকারী ও প্রযুক্তিনির্ভর দূরদর্শিতার কথা বিশদভাবে তুলে ধরেন— ১. স্বাস্থ্য খাতে ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কার্ড’ : স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দেশের সব নাগরিকের জন্য ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কার্ড’ চালুর মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই ডিজিটাল কার্ডটি সমন্বিত রোগী ব্যবস্থাপনা (ইন্টিগ্রেটেড পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) ও দেশব্যাপী রেফারেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
এর মাধ্যমে দেশের যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগীর আগের চিকিৎসা, পরীক্ষা, ওষুধ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে। এতে চিকিৎসার মান উন্নত হবে, চিকিৎসাগত ভুল ও অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্ত প্রেসক্রিপশন কমবে। রোগীরা আরও দ্রুত, সুশৃঙ্খল ও কার্যকর সেবা পাবেন -আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি, দেশের ২২টি নিউক্লিয়ার মেডিসিন ইনস্টিটিউটকে একটি অনলাইন নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে তৈরি করা হচ্ছে ‘সমন্বিত নিউক্লিয়ার মেডিসিন তথ্যব্যবস্থা’।
২. শিক্ষা খাতে প্রযুক্তির ছোঁয়া ও ‘এডু-আইডি’ : শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বমানের ও প্রযুক্তিবান্ধব করতে নেয়া হয়েছে একাধিক সময়োপযোগী পদক্ষেপ। ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব : শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তায় এই বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। স্বতন্ত্র এডু-আইডি : প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি অনন্য বা ইউনিক ‘এডু-আইডি’ চালু করা হচ্ছে।
ডিজিটাল অবকাঠামো : মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ স্থাপন, ফ্রি ওয়াই-ফাই সম্প্রসারণ এবং সর্বাধুনিক ডিজিটাল লাইব্রেরি স্থাপন। ভবিষ্যতের শিক্ষা : শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, কোডিং এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক স্তরেই পরিচিত করা হবে। ৩. সামাজিক সুরক্ষায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ওয়ান-স্টপ রেজিস্ট্রি : সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ভাতা বণ্টনকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও মধ্যস্বত্বভোগী মুক্ত করতে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রায় ৪ কোটি উপকারভোগীর তথ্য সংরক্ষণের জন্য তৈরি হচ্ছে কেন্দ্রীয় ‘সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেম’। ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি : এর মাধ্যমে দেশের যেকোনো স্থান থেকে নাগরিকরা অনলাইনে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য সরাসরি আবেদন করতে পারবেন।
জি-টু-পি পদ্ধতি : ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীর কাছে ভাতার টাকা পৌঁছে যাবে। এর ফলে একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা নেয়ার সুযোগ বন্ধ হবে। ডিজিটাল সিঙ্গেল উইন্ডো : বিনিয়োগ-সংক্রান্ত আবেদন, যাচাই ও লাইসেন্স প্রদানের সব সেবা অনলাইনে মিলবে। আবেদন করার ৭ দিনের মধ্যে সেবা দেয়ার আইনি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাবিজ : এটি একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যা দ্রুত, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক অনুমোদন নিশ্চিত করবে।
দ্রুত নিবন্ধন : কোম্পানির নাম ছাড়পত্র ও মূল নিবন্ধন প্রক্রিয়া মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অনলাইনে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড করদাতাদের হয়রানি বন্ধে শতভাগ ডিজিটাল হওয়ার পথে হাঁটছে। স্বয়ংক্রিয় ও ‘ফেসলেস’ কর ফেরত : অতিরিক্ত পরিশোধিত করের টাকা কোনো দপ্তরে না গিয়েই সরাসরি করদাতার ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। বাধ্যতামূলক ই-রিটার্ন ও ই-ভ্যাট : করদাতাদের কর অফিসে যাওয়ার ভোগান্তি দূর করতে অনলাইনে আয়কর দাখিল এবং ভ্যাট রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এ-চালান : আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সরকারি রাজস্ব সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার জন্য ‘এ-চালান’ ব্যবস্থা পুরোপুরি বাধ্যতামূলক হচ্ছে।
প্রযুক্তি এখন শুধু দাপ্তরিক কাজেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং দেশের অবকাঠামো ও পরিবেশ রক্ষায়ও ব্যবহূত হচ্ছে— ১. ট্রি মনিটরিং অ্যাপ : দেশব্যাপী বনসৃজন ও বৃক্ষরোপণ তদারকিতে এই অ্যাপ ব্যবহূত হচ্ছে। ২. অও ভিত্তিক ড্যাশবোর্ড : ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। ৩. ডিজিটাল নজরদারি : জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও অপচয় রোধে ২,৭০০-এর বেশি জ্বালানি পরিবাহী ট্যাংক লরিকে ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। ৪. আগাম সতর্কবার্তা : দুর্যোগের পূর্বাভাস সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও এসএমএসভিত্তিক আধুনিক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সর্বোপরি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বৃহৎ ডিজিটাল রূপান্তর কর্মসূচিটি কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়, এটি নাগরিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করার একটি মহতি উদ্যোগ।
স্বাস্থ্য কার্ড থেকে শুরু করে এডু-আইডি কিংবা ফেসলেস কর ব্যবস্থা প্রতিটি পদক্ষেপই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ সরকারি সেবার সনাতন আমলাতান্ত্রিক মডেল থেকে বেরিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক, সাশ্রয়ী এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট যুগে পদার্পণ করছে। তবে এই বিশাল নেটওয়ার্কের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষকে এই প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষ করে তোলাই হবে আগামী দিনগুলোর মূল চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে মোকাবিলা করা গেলে, ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল রূপান্তর বাংলাদেশের ইতিহাসে সুশাসনের একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।