বায়ুদূষণ এবং যানজটে জর্জরিত ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। সরকার রাজধানীর সড়কে যুক্ত করতে যাচ্ছে ৪০০টি অত্যাধুনিক ইলেকট্রিক বাস। আড়াই হাজার কোটি টাকার এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন কার্বন নিঃসরণ কমবে, তেমনি জনজীবনে স্বস্তি ফেরার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে ঢাকার গণপরিবহনের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ বাস, যা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘নির্মল বায়ু প্রজেক্ট’-এর আওতায় চীন থেকে ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় এ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে সহায়তা দিচ্ছে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) জানিয়েছে, বাসগুলো ধাপে ধাপে আনা হবে- প্রথম পর্যায়ে ১৫০টি এবং পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট ২৫০টি বাস ঢাকা মহানগরীতে যুক্ত হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে পুরো ৪০০টি বাসই সড়কে পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন নগর বিশেষজ্ঞ ও পরিবহন বিশ্লেষকরা। তবে তারা কেবল বাস আনা নয়, বরং টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছেন। পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, ‘ঢাকার সড়কের মূল সমস্যা হলো ছোট ছোট ব্যক্তিগত যানবাহনের আধিক্য। বড় বাসগুলোর চলার জায়গা দখল করে নিচ্ছে ছোট গাড়িগুলো। পুরো পৃথিবীতেই গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়, কিন্তু আমাদের এখানে উল্টো চিত্র। এই বাসগুলো নামানোর পাশাপাশি বড় বাস চলাচলের জন্য প্রশস্ত ও নির্বিঘ্ন রাস্তা নিশ্চিত করতে হবে।’
পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘ইলেকট্রিক বাস নিঃসন্দেহে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। তবে এর সফলতার জন্য পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ওয়ার্কশপ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। অবকাঠামোগত এই সাপোর্ট দিতে পারলে সরকার তার লক্ষ্য অর্জনে সফল হবে।’ ডিটিসিএ-এর ট্রান্সপোর্ট ইঞ্জিনিয়ার কে এম তৌফিকুল হাসান জানান, “বাসগুলো সরকারি ও বেসরকারি উভয় অপারেটরের মাধ্যমেই পরিচালিত হবে। আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে এগুলোকে সুনির্দিষ্ট রুটগুলোতে ‘বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি’ বা কোম্পানিভিত্তিক সিস্টেমে পরিচালনা করার, যাতে যাত্রী ভোগান্তি ও প্রতিযোগিতা কমে।”
ইলেকট্রিক বাস চালু করলেই ঢাকার সব সমস্যা রাতারাতি সমাধান হবে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই প্রকল্পের সাফল্যের জন্য বেশ কিছু বিষয়ে নজর দেয়া প্রয়োজন। ১. বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি: অরাজকতা দূর করতে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা পদ্ধতি দ্রুত কার্যকর করা। ২. অবকাঠামো: পর্যাপ্ত ও আধুনিক চার্জিং স্টেশন স্থাপন, যা বাসের কর্মক্ষমতা বজায় রাখবে। ৩. দক্ষ চালক ও জনবল: ইলেকট্রিক বাস পরিচালনার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক ও কারিগরি দল গড়ে তোলা। ৪. ফুটপাত ও দখলমুক্ত রাস্তা: বড় বাস চলাচলের জন্য রাস্তার প্রশস্ততা নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করা।
ঢাকার বায়ুর মান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম খারাপ অবস্থানে রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত বাসের বদলে ইলেকট্রিক বাস চালু হলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। এছাড়া শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণেও এই বাসগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এটি কেবল যাতায়াত ব্যবস্থাই উন্নত করবে না, বরং ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য ও আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পথে এক বড় পদক্ষেপ হবে।
আড়াই হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটি ঢাকার নাগরিক জীবনের ভোগান্তি কমাতে এবং পরিবেশ রক্ষায় একটি মাইলফলক হতে পারে। তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে সঠিক বাস্তবায়ন, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ওপর। শুধু বাস কেনাই যথেষ্ট নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের অধীনে এই ইলেকট্রিক বাসগুলো পরিচালিত হলে তবেই নগরবাসী এর সুফল পাবে। প্রযুক্তির ব্যবহার ও পরিকল্পিত নগরায়ণের সমন্বয়ে ঢাকা মহানগরী আগামী দিনে পরিবেশবান্ধব এক যাতায়াত ব্যবস্থার সাক্ষী হতে যাচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।