ভরা মৌসুমেও মিলছে না ইলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ১২:৫৭ এএম
  • হাতিয়ায় লক্ষাধিক মানুষের জীবন এখন অনিশ্চিত
  • জেলেদের হাহাকার ও দেনার বোঝা

বাংলাদেশের ইলিশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র নোয়াখালীর হাতিয়া। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ইলিশের ভরা মৌসুম চললেও হাতিয়ার ২০টি মৎস্য ঘাটে এখন নেই কোনো কর্মচাঞ্চল্য। জেলে, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের চোখেমুখে আজ শুধুই হতাশার ছাপ। কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার লক্ষাধিক মানুষের জীবন এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

প্রতিবছর এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত জেলেরা ইলিশ শিকারে ব্যস্ত সময় পার করেন। নিঝুমদ্বীপ, সূর্যমুখী, কাজীরবাজার ও চেয়ারম্যানঘাটসহ বড় ২০টি ঘাটে প্রায় ১০ হাজার জেলে নৌকা সাগরে বিচরণ করার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ নৌকাই এখন ঘাটে নোঙর করা। ঘাটে নেই বরফ ভাঙার আওয়াজ বা আড়তদারের হাঁকডাক। সব মিলিয়ে পুরো এলাকা যেন এক নীরব বিষাদপুরী। সূর্যমুখী ঘাটের প্রবীণ জেলে আব্দুল আলী জানান, অভাবের তাড়নায় ভোলার দৌলতখা থেকে এসে হাতিয়ায় আস্তানা গেড়েছেন। কিন্তু গত দেড় মাসে একটি টাকাও বাড়িতে পাঠাতে পারেননি। জ্বালানি ও খাবারের খরচ মেটাতে গিয়ে অধিকাংশ জেলে এখন ঋণের জালে জর্জরিত। নবির সর্দার নামের এক ঘাট শ্রমিক জানান, প্রতিদিন মাছের ট্রলার থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব। অনেক শ্রমিকই এখন পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন।

হাতিয়া সূর্যমুখী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি জবিয়ল হক জানান, ইলিশ না পাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অনেক নৌকার মালিক মাছ শিকার বন্ধ করে দিয়েছেন। যারা ঝুঁকি নিয়ে নদীতে যাচ্ছেন, তারাও খালি হাতে ফিরে আসায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অনেক জেলে বাধ্য হয়ে গোপনে অন্য জেলায় পাড়ি জমাচ্ছেন।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান এই পরিস্থিতির পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন— জাটকা ও মা ইলিশ নিধন: নিয়ম অমান্য করে অসাধু চক্রের মাছ শিকার। পরিবেশগত প্রভাব: নদীদূষণ ও উপকূলীয় কলকারখানার বর্জ্য নিঃসরণ। প্রাকৃতিক পরিবর্তন: ডুবোচরের বিস্তার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মাছের বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মৌসুমের বাকি সময়ে মাছের দেখা মিলতে পারে।

তবে মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীদূষণ রোধ এবং জাটকা নিধন বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি কঠোর নজরদারি ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন। হাতিয়ার মৎস্যজীবীদের এই দুরবস্থা কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি একটি বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত। ভরা মৌসুমে ইলিশ না পাওয়া জেলেদের জন্য এক প্রকার অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি সহায়তা এবং মৎস্যজীবীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার পাশাপাশি নদীর নাব্য ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি এখন অত্যন্ত জরুরি।

কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনে হাতিয়ার মৎস্য শিল্প অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। জেলেদের জীবন বাঁচানো এবং ইলিশের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র নিরাপদ রাখাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।