প্রতিটি শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই নতুন বইয়ের গন্ধ ভেসে আসে দেশজুড়ে লাখো শিক্ষার্থীর আঙিনায়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেয়া কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি জাতীয় শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার মান উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। তবে বিগত বছরগুলোতে বছরের শুরুতে সব বই হাতে না পাওয়া, মুদ্রণে বিলম্ব এবং বিতরণ ব্যবস্থাপনার নানাবিধ জটিলতায় শিক্ষার্থীরা যে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, তা এড়াতে এবার আগেই কোমর বেঁধে নামছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। দীর্ঘদিনের এই ধীরগতি ও সরবরাহ সংকট কাটানোর লক্ষ্যে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে এক যুগান্তকারী ও মহাপরিকল্পিত নতুন রূপরেখা উন্মোচন করেছে সংস্থাটি। এই দূরদর্শী পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য স্পষ্ট ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিনটিকে ঘিরে অপেক্ষার প্রহর না বাড়িয়ে, তার আগেই অর্থাৎ ২০২৬-এর ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে শতভাগ পাঠ্যবই পৌঁছে দেয়া।
শিক্ষা খাতের এই অভূতপূর্ব পরিবর্তন ও সময়ানুগ পদক্ষেপ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। এনসিটিবির প্রকাশিত নতুন রূপরেখায় বই সংস্কার, পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত, দরপত্র আহ্বান, প্রাক্কলন থেকে শুরু করে মুদ্রণ ও পরিবহন সংক্রান্ত প্রতিটি ধাপের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। পূর্বের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রক্রিয়ার প্রতিটি ফাঁকফোকর বন্ধ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা। সাধারণত শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত কিছু কিছু শ্রেণির বই পৌঁছে দেয়ার যে অপ্রীতিকর ধারাবাহিকতা দেখা যেত, নতুন রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে তার স্থায়ী অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। ডিসেম্বরের মধ্যে শতভাগ পাঠ্যবই স্কুলে স্কুলে পৌঁছে গেলে শিক্ষকরা বর্ষসূচির শুরু থেকেই পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিয়ে পাঠদান শুরু করতে পারবেন, যা শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে বাড়তি মানসিক চাপ কমাবে এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একই সাথে এই রূপরেখা মুদ্রণ শিল্পের সঙ্গে জড়িত স্টেকহোল্ডারদের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। নির্দিষ্ট সময়ে বই সরবরাহের ক্ষেত্রে এনসিটিবির কড়া নজরদারি, প্রেস মনিটরিং এবং মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। কেবল সময়মতো বই পৌঁছানোই নয়, বরং কাগজের মান ও বাঁধাই যেন আন্তর্জাতিক মানের হয়, সেদিকেও রাখা হচ্ছে বিশেষ দৃষ্টি। এনসিটিবির এই কঠোর ও সময়োপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, সংকট কাটানোর চিরাচরিত ব্যবস্থার চেয়ে আগাম পরিকল্পনা গ্রহণই টেকসই সমাধানের একমাত্র পথ। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যদি সারা দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের স্কুলগুলোতেও শতভাগ পাঠ্যবই পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়, তবে তা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে এবং বছরের প্রথম দিনেই উৎসবের আমেজ ফিরে পাবে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ।
এনসিটিবির নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, বই সরবরাহের প্রক্রিয়ায় বৈষম্য দূর করতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে আগাম সরবরাহ (৩০ নভেম্বর): আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় সব শ্রেণির শতভাগ পরিমার্জিত বই পৌঁছে দেয়ার কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। ৫০ শতাংশ আঞ্চলিক সমতা: মুদ্রণকারীদের স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, ঢাকা বা বড় শহরের পাশাপাশি সব শ্রেণির অন্তত ৫০ শতাংশ বই দেশের প্রতিটি উপজেলায় আগে পৌঁছাতে হবে। প্রাথমিক লক্ষ্য (ডিসেম্বরের মাঝামাঝি): বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্রই ছুটির দিনে প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর হাতে পুরো সেট বই পৌঁছে দেয়া। বিকল্প পরিকল্পনা (১ জানুয়ারি): কোনো কারণে প্রাথমিক লক্ষ্য ব্যাহত হলে আগামী বছরের ১ জানুয়ারির মধ্যেই শতভাগ বিতরণ সম্পন্ন নিশ্চিত করা।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নতুন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেছেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে নতুন পাঠ্যবই পৌঁছে দেয়া। সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নির্ধারিত সময়ের আগেই সম্পন্ন করা হচ্ছে। বইয়ের মান, স্বচ্ছতা এবং সঠিক সময়ে কাজ শেষ করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।’
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল এবং কারিগরি স্তরের জন্য মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের দরপত্র প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। অতীতে বই ছাপা শুরু হলেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কাগজের দাম বাড়ানোর যে প্রবণতা লিয়াজোঁ সিন্ডিকেটগুলোর মাধ্যমে দেখা যেত, তা মোকাবিলায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। পিপিআর-২০২৫ অনুসরণে সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ধরে কার্যক্রম পরিচালনা।
কাগজের মান ও জিপিএম ঠিক রাখতে এনসিটিবির নিজস্ব মনিটরিং টিম গঠন। মুদ্রণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি ব্যবস্থা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও ইতিহাসের বিকৃতি দূর করার অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর-এর শিক্ষাবিদ, কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ ও নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদদের সমন্বয়ে বিশেষ ওয়ার্কশপ আয়োজন করা হচ্ছে।
ভাষা আন্দোলন: ভাষা আন্দোলনের গোড়াপত্তন সংক্রান্ত ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক সত্য উপস্থাপন করা হচ্ছে (বিগত সরকারের ১৯৪৮ সালের প্রচারণা থেকে মুক্ত করে)।
স্বাধীনতার ঘোষণা: শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ‘ঘোষণা’ পাঠ্যবইয়ে যথাযথ মর্যাদায় পুনর্বহাল করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আসক্তি (মোবাইল ও ফেসবুক) কমিয়ে তাত্ত্বিক পড়াশোনাকে আনন্দময় করতে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে তিনটি নতুন বই ও বিষয় যুক্ত হচ্ছে। শিক্ষা প্রশাসন জানিয়েছে, এই রূপরেখাটি পরবর্তীতে ২০২৮ সালের পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক কারিকুলাম বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
পরিশেষে বলা যায়, বছরের শুরুতেই পূর্ণাঙ্গ সেট বই বিতরণ নিশ্চিত করার এই মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। অতীতের আঞ্চলিক বৈষম্য, মুদ্রণ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের বিকৃতি রোধে সরকার যে কঠোর ও স্বচ্ছ কৌশল গ্রহণ করেছে, তা সময়মতো বাস্তবায়িত হলে দেশের চার কোটি শিক্ষার্থীর শিখন প্রক্রিয়া গতিশীল হবে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের এই আগাম প্রস্তুতি ও নতুন ধারার শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।