রূপ বদলে আরও বিপজ্জনক ডেঙ্গু

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম

বছরের প্রায় প্রতি মৌসুমেই ডেঙ্গু রোগীর দেখা মিললেও এবার বর্ষাকাল শেষ হওয়ার আগেই এর প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। শুধু আক্রান্তের সংখ্যাই নয়, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গুর রূপ পরিবর্তন ও উপসর্গের ভিন্নতা। সাধারণ তীব্র জ্বর ও শরীরের ব্যথার পাশাপাশি এবার রোগীদের মধ্যে ডায়রিয়া ও দ্রুত অঙ্গ বিকল হওয়ার মতো জটিল লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যা ডেঙ্গুকে আরও বেশি মারাত্মক করে তুলছে।

চিকিৎসকদের মতে, প্রতি বছরই ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরন ও উপসর্গে কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। তবে এবারের পরিবর্তিত রূপ চিকিৎসকদের বাড়তি উদ্বেগে ফেলেছে। প্রধান নতুন উপসর্গ: স্বাভাবিক তীব্র জ্বর ও শরীর ব্যথার সঙ্গে এবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। জটিল পরিস্থিতি: রোগটি জটিল পর্যায়ে পৌঁছালে মানবদেহের কিডনিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মৃত্যু ও আক্রান্তের পরিসংখ্যান: চলতি বছরে ইতোমধ্যে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৯ জনে।

ডেঙ্গুর এই নতুন রূপ মোকাবিলায় সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ঈশিতা বিশ্বাস বলেন, ‘ডেঙ্গুর উপসর্গে পরিবর্তন আসায় আমাদের চিকিৎসার পদ্ধতিতেও কিছু সমন্বয় আনতে হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, রোগী যদি অবহেলা না করে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন, তবে ৯০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠছেন।’

চিকিৎসকরা স্পষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন যে, তিন দিনের বেশি জ্বর স্থায়ী হলে কিংবা সামান্য ডায়রিয়া ও শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে কোনোভাবেই বাসায় অবহেলা করা যাবে না। অতি দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। একেক বছর একেক ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়ায় দেশের সার্বিক ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা নীতিতেও পরিবর্তন আনার জোর দাবি উঠেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রধান সুপারিশসমূহ— জাতীয় গাইডলাইন পরিমার্জন: নতুন উপসর্গের আলোকেই ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা গাইডলাইন দ্রুত আপডেট করা। প্রান্তিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ: জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের নতুন উপসর্গ ও চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান। সমন্বিত উদ্যোগ: মশকনিধন ও চিকিৎসাসেবার মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় গড়ে তোলা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজির আহমেদ জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও আক্রান্তদের চিকিৎসা কোনো একক সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন এবং সাধারণ নাগরিকদের যৌথ ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় জোর দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

পরিশেষে বলা যায়, ডেঙ্গুর ধরন ও উপসর্গের এই বিপজ্জনক পরিবর্তন স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, কেবল পুরাতন চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন অভিযানের পাশাপাশি জাতীয় গাইডলাইন হালনাগাদ করা এবং প্রান্তিক পর্যায়ের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং তিন দিনের বেশি জ্বর হলে অবিলম্বে হাসপাতালে নেয়ার সিদ্ধান্তই পারে এই প্রাণঘাতী ডেঙ্গু থেকে মূল্যবান জীবন রক্ষা করতে।