নিরাপদ ঢাকা গড়ার প্রত্যয় ডিএমপি কমিশনারের 

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম
  • মাদক, ছিনতাই ও অপরাধ নির্মূলে কড়াকড়ি 
  • কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদের কঠোর নির্দেশনা

রাজধানী ঢাকা মহানগরীর সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং মাদক, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো সামাজিক অপরাধসমূহ মূল উৎপাটনে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। 

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদের প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব, দূরদর্শী দিকনির্দেশনা ও কৌশলগত পরিকল্পনায় রাজধানীর প্রতিটি বিভাগে পরিচালিত হচ্ছে বিশেষ ও সমন্বিত অভিযান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই কঠোর অবস্থানের ফলে অপরাধী চক্রের তৎপরতা স্তব্ধ হতে শুরু করেছে এবং নগরবাসীর মাঝে ফিরে আসছে স্বস্তি।

সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ও অপরাধপ্রবণ স্পটগুলোতে ২৪ ঘণ্টার ঝটিকা ও বিশেষ চিরুনি অভিযান চালিয়ে শত শত অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। একই সাথে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত যানবাহন।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কমিশনারের কঠোর নীতি

ঢাকা মহানগরের সাড়ে চার কোটিরও বেশি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ স্পষ্ট ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন- নগরীতে মাদক কারবারি, পেশাদার ছিনতাইকারী, ডাকাত কিংবা যেকোনো ধরনের অপরাধীর কোনো স্থান হবে না।

ডিএমপি কমিশনারের প্রধান নির্দেশনাসমূহ

জিরো টলারেন্স নীতি: মাদকের বিস্তার রোধ ও ছিনতাইকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
মোবাইল পেট্রোলিং ও চেকপোস্ট বৃদ্ধি: রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়, গলি ও অপরাধপ্রবণ স্থানে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি বাড়াতে হবে।
সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক অভিযান: ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে স্পট অভিযান পরিচালনা করা।
জনবান্ধব সেবা: ভিকটিম ও সাধারণ নাগরিকদের সর্বোচ্চ আইনি ও মানবিক সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করা।

কমিশনারের এই সময়োপযোগী ও দূরদর্শী কৌশল বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

২৪ ঘণ্টায় ডিএমপির বিশেষ অভিযান

নগরীতে অপরাধের লাগাম টানতে ডিএমপির নিয়মিত ও বিশেষ অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় পরিচালিত অভিযানে মোট ৪৬৩ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সাথে দায়ের করা হয়েছে ৪০টি পৃথক মামলা।

বিভিন্ন বিভাগের গ্রেপ্তার চিত্র:

  • মিরপুর বিভাগে সর্বোচ্চ ১২৫ জন
  • তেজগাঁও বিভাগে ৬৩ জন
  • উত্তরা বিভাগে ৫৯ জন
  • লালবাগ বিভাগে ৫৪ জন
  • ওয়ারী বিভাগে ৪৭ জন
  • মতিঝিল বিভাগে ৪৭ জন
  • গুলশান বিভাগে ৩৬ জন
  • রমনা বিভাগে ৩১ জন
  • গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) ১ জন

জব্দকৃত মাদক ও অবৈধ সরঞ্জামাদি

অভিযানকালে গ্রেপ্তারকৃতদের হেফাজত থেকে ৭০ কেজি ১০০ গ্রাম গাঁজা, ১ হাজার ৬৫৩ পিস ইয়াবা, ৫০ পুরিয়া হেরোইন এবং ৮৬ বোতল এস্কাফ সিরাপ (ফেন্সিডিল) উদ্ধার করা হয়। এছাড়া একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগজিন ও চার রাউন্ড গুলিসহ দুটি পিকআপ, সাতটি মোবাইল ফোন এবং মাদক বিক্রির ১৭ হাজার ৫৫০ টাকা নগদ জব্দ করা হয়েছে।

এছাড়াও অভিযানকালে পুলিশ এক ভিকটিমাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে স্ব-স্ব থানায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

থানা পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান

ডিএমপির বিভিন্ন থানা এলাকাকে অপরাধমুক্ত করতে কমিশনারের নির্দেশে চালানো হচ্ছে বিশেষ নজরদারি ও কম্বিং অপারেশন। সম্প্রতি যাত্রাবাড়ী, মুগদা, বংশাল ও তেজগাঁও বিভাগে পুলিশের বিশেষ অভিযানে একাধিক চিহ্নিত অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

যাত্রাবাড়ী, মুগদা ও বংশালে ৪২ জন গ্রেপ্তার

যাত্রাবাড়ী, মুগদা ও বংশাল থানা পুলিশ অত্র থানাধীন চিহ্নিত অপরাধপ্রবণ স্থানে রাতভর বিশেষ অভিযান চালিয়ে মোট ৪২ জন অপরাধীকে আটক করেছে। 

শনিবার যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ও পেশাদার অপরাধীসহ ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাছাড়া শুক্রবার মুগদা থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত ১২ জনকে আটক করে। বংশাল থানা এলাকা থেকে ৮ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

মতিঝিলে ৭০ কেজি গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

অপরাধের বড় উৎস মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে ডিএমপির গোয়েন্দা মতিঝিল বিভাগ একটি সফল অভিযান পরিচালনা করেছে। শনিবার সকালে যাত্রাবাড়ী থানাধীন ধোলাইপাড় মোড়ের টুঙ্গীপাড়া এক্সপ্রেসের সামনে পাকা রাস্তার ওপর অভিযান চালিয়ে মো. রমজান চৌধুরী (২০) নামের এক চিহ্নিত মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে ৭০ কেজি গাঁজা ও মাদক বহনে ব্যবহৃত একটি নীল রঙের পিকআপ ভ্যান জব্দ করা হয়েছে। এ বিষয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

তেজগাঁও বিভাগে ৬৫ জন গ্রেপ্তার

তেজগাঁও বিভাগের শেরেবাংলা নগর, মোহাম্মদপুর, আদাবর, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও হাতিরঝিল থানা এলাকায় পরিচালিত অভিযানে একযোগে ৬৫ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানা এলাকা থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় ৩০ জনকে। আটককৃতদের মধ্যে নিয়মিত মামলার আসামি ছাড়াও ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যরা রয়েছে।

ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর ডিএমপি

নগরীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সড়ক পরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অপরাধে রাজধানীর বিভিন্ন বিভাগে অভিযান চালিয়ে একদিনেই ১,৭৪৪টি মামলা, দায়ের করা হয়েছে।

ট্রাফিক বিভাগওয়ারী মামলার পরিসংখ্যান: 

  • ট্রাফিক-মিরপুর বিভাগে ৩৮২টি মামলা
  • ট্রাফিক-মতিঝিল বিভাগে ২৯৫টি মামলা
  • ট্রাফিক-উত্তরা বিভাগে ২৫০টি মামলা
  • ট্রাফিক-তেজগাঁও বিভাগে ২১২টি মামলা
  • ট্রাফিক-গুলশান বিভাগে ১৮৯টি মামলা
  • ট্রাফিক-ওয়ারী বিভাগে ১৮৭টি মামলা
  • ট্রাফিক-লালবাগ বিভাগে ১৪৩টি মামলা
  • ট্রাফিক-রমনা বিভাগে ৮৬টি মামলা

অভিযানকালে ট্রাফিক আইন অমান্য করায় মোট ৫০৪টি গাড়ি ডাম্পিং এবং ২৬৫টি গাড়ি রেকার করা হয়েছে। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, সিএনজি এবং হেলমেটবিহীন ও উল্টো পথে চালানো মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে এই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ঢাকা মহানগর এলাকায় যানজট নিরসন ও শৃঙ্খলা রক্ষায় এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।

হারিয়ে যাওয়াদের সন্ধানে ডিএমপির তৎপরতা

অপরাধ দমনের পাশাপাশি মানবিক পুলিশিংয়ের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছে ডিএমপি। সাম্প্রতিক সময়ে পথভুল ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের সহায়তায় কাজ করছে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার ও থানা পুলিশ।

রওশন আরা (৬০)-এর সন্ধান চায় পরিবার

ভাষানটেক থানাধীন কচুক্ষেত এলাকায় এলোমেলোভাবে ঘোরাফেরা করা ৬০ বছর বয়সী রওশন আরা নামে এক বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখা হয়েছে। তার উচ্চতা ৪ ফুট ৪ ইঞ্চি, গায়ের রং ফর্সা এবং পরনে ছিল বেগুনী রঙের মেক্সি ও এস কালারের ওড়না। 

তিনি নিজের সঠিক ঠিকানা বলতে পারছেন না। এ বিষয়ে ভাষানটেক থানায় একটি জিডি (নং-১১১৬, তারিখ ২৫/০৭/২০২৬) করা হয়েছে। কোনো সহৃদয় ব্যক্তি তার পরিবারের সন্ধান পেলে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের মোবাইল নম্বরে (০১৩২০-০৪২০৮৫) অথবা টিএনটি নম্বরে (০২-৪১০২৪৮৪৮) যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হয়েছে।

নিখোঁজ সোমাইয়া আক্তার মেঘা (১৭)

রাজধানীর শ্যামপুর থানাধীন পশ্চিম ধোলাইপাড় এলাকা থেকে গত ১৯ জুলাই ২০২৬ থেকে নিখোঁজ রয়েছে ১৭ বছর বয়সী সোমাইয়া আক্তার মেঘা। তার পিতা মো. মনির হোসেন শ্যামপুর থানায় এ বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-১১৭২, তারিখ: ২০/০৭/২০২৬) করেছেন। মেঘার গায়ের রং শ্যামলা এবং উচ্চতা ৫ ফুট ২ ইঞ্চি। কোনো ব্যক্তি তার সন্ধান পেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রুবেল মিত্র (০১৮৭৫-১৫৩২৬৬) বা শ্যামপুর থানার ডিউটি অফিসার (০১৩২০-০৪০৪৮৮) নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। 

নিরাপদ ঢাকা গড়ার প্রত্যয়

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদের বিচক্ষণ নেতৃত্ব ও নিবিড় তদারকিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বর্তমানে একটি গতিশীল ও জনমুখী সংস্থায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে অপরাধীদের গ্রেপ্তার, বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নগরীতে যে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা অপরাধীদের থমকে দিতে বাধ্য করেছে।

নগরবাসীর নিরাপত্তা বিধান এবং অপরাধ মুক্ত ঢাকা গড়ার এই প্রত্যয় অব্যাহত রাখতে পুলিশ ও পাবলিকের অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ডিএমপি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে- জনগণের শান্তি বিনষ্টকারী কোনো অপরাধীকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।

এএন