খরস্রোতা সুবর্ণখালী এখন মরা খাল

সরিষাবাড়ী (জামালপুর) প্রতিনিধি প্রকাশিত: জানুয়ারি ২০, ২০২৩, ০৩:৪৯ পিএম

জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী দিয়ে প্রবাহমান ছিল খরস্রোত নদী সুবর্ণখালী। তবে অবহেলা, দূষণ আর দখলদারদের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে ভরাযৌবন হারিয়ে এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে নদীটি।
জানা যায়, জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী দিয়ে প্রবাহমান এই ঐতিহ্যবাহী নদী সরিষাবাড়ী পৌরসভার চম্পাকলি সিনেমা হল হয়ে পিংনা ইউনিয়ন ও টাঙ্গাইলের গোপালপুরের মধ্য দিয়ে প্রবাহমান ছিলো।

১৭৮২ থেকে ১৭৮৭ সালের ভূমিকম্প ও বন্যার কারণে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ঝিনাই খাল থেকে ব্রহ্মপুত্রের নিম্নপ্রবাহ যমুনা নদীর উৎপত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত সুবর্ণখালীই ছিল জামালপুরের প্রধান নদী।

শুধু প্রধান নদী নয়, এক সময় সুবর্ণখালি ছিল যমুনা তীরের প্রসিদ্ধ নদীবন্দর। তখন কলকাতার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের কারণে সুবর্ণখালিতে আসাম ও কলকাতার স্টিমার আসতো।

টাঙ্গাইলের হেমনগরের জমিদার হেমচন্দ্র চৌধুরীসহ কয়েকজন হিন্দু জমিদারের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় ১৯০৫ সালে ময়মনসিংহ থেকে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণ করা হয়।

যা রেল ও স্টিমারযোগে ঢাকার সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগকে সহজ করে। জমিদার হেমবাবু সুবর্ণখালি থেকে সরিষাবাড়ী উপজেলার জগন্নাথগঞ্জ ঘাট পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার সড়কে হেরিংবন্ড করে টমটম বা পালকিতে যাতায়তের ব্যবস্থা করেন।

ঊনবিংশ শতাব্দির শেষ দশকে যমুনার করাল গ্রাসে বিলীন হয় সুবর্ণখালি নদীবন্দর ও হেমচন্দ্রের রাজবাড়ী। দখলদারের দখলে সুবর্ণখালি ঐতিহ্য হারিয়ে আজ সোনামুই/সোনামুখী নাম ধারণ করে নিজের অস্তিত্ব টেকাতে সংগ্রাম করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারির অভাবে জলাধার সংরক্ষণ আইনের তোয়াক্কা না করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদী দখল করে পাকা স্থাপনা গড়ে তুলেছেন।

সরিষাবাড়ী পৌরসভা সংলগ্ন নদীর পাড় দখল করে একের পর এক গড়ে তোলা হচ্ছে স্থাপনা।

সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘিরে নির্মাণ করা হয়েছে ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার। যে সকল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ময়লা-আবর্জনা ( যেমন: অব্যবহৃত ছুরি, কাঁচি, সিরিজ, সুচ ইত্যাদি) ফেলেও দূষিত করা হচ্ছে নদীর পানি। ময়লা আবর্জনায় ভরাট হয়ে নদীর গভীরতা ক্ষীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
এলাকাবাসী জানান, এক সময় এই নদীটি ছিল খরস্রোতা প্রবাহমান। ঝিনাই ও ব্রহ্মপুত্রের জন্মের আগে এটি ছিল জামালপুরের প্রধান নদী। নদীর বুকে অসংখ্য পাল তোলা নৌকা পণ্যবোঝাই স্টিমার যাতায়াত করতো।

প্রাচীনকালে এ নদীপথ ছিল ব্যবসা বাণিজ্যের অন্যতম মাধ্যম। প্রভাবশালী ভূমিখেকোদের আগ্রাসনে যৌবন হারিয়েছে ঐতিহ্যবাহী এ নদী। এখন নিজ অস্তিত্ব টিকেয়ে রাখছে সংগ্রাম করছে সুবর্ণখালী।
স্থানীয় শামীম উদ্দিন বলেন, এক সময় আমরা এ নদীতে মাছ শিকার করতাম। এখন ক্লিনিকের ময়লা আবর্জনার জন্য এখানে নামতে সবাই ভয় পাই। পানি দূষিত হওয়ায় এখানে নামলে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ হয়। যার কারণেএখানে এখন আর কেউ মাছ শিকার বা গোসলের জন্য নামে না।
স্থানীয় আব্দুল আজিজ বলেন, এক সময় এখানে বড় বড় জাহাজ আসতো। নদীতে স্রোত ছিলো অনেক বেশি। তবে নদীর উত্তর দিকে বাঁধ নির্মাণ করায় এখন আর স্রোত আসে না, তাই মানুষের ফেলা ময়লা আর্বজনা নদীর স্রোতে দক্ষিণে সরে না গিয়ে এখানে দীর্ঘ সময় থাকে। এতে নদীর গভীরতাকে কমছে।

তিনি আরও বলেন, এক সময় নদীর প্রস্থও অনেক চওড়া ছিল, দখলদাররা মাটি ফেলে বিভিন্ন স্থাপনা নিমার্ণ করেছে, তাই এখন আর এটা নদী নেই খালে পরিণত হয়েছে। এখনো সময় আছে যদি প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়, হয়তোবা সুবর্ণখালী নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, আমি গত সপ্তাহে সুবর্ণখালী নদী সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। সেখানে কাগজে কলমে অবৈধ দখলদার শুধুমাত্র একজন। আমি তার তালিকা ডিসি অফিসে পাঠিয়েছি, এখন ডিসি অফিস থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 
জেলা প্রসাশক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শ্রাবস্তী রায় বলেন, অবৈধ দখলদারের বিষয়ে মামলা হয়েছে। আর দূষণের বিষয়ে ব্যবস্থার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এআরএস