লক্ষ্মীপুরে ভোটের সিল উদ্ধারে জামায়াত নেতাসহ দুজনের বিরুদ্ধে মামলা

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৭:৪৪ পিএম

নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে রাজনৈতিক দলগুলো যখন মাঠপর্যায়ে ব্যস্ত কমা ঠিক তখনই লক্ষ্মীপুরে উদ্ধার হওয়া ৬টি ভোটের সিল পাল্টে দিয়েছে স্থানীয় রাজনীতির আবহ। সাধারণ একটি প্রেস থেকে সরকারি কাজের সিল উদ্ধারের ঘটনাটি এখন কেবল আইনি প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নেই কমা বরং এটি রূপ নিয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার এক চরম রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে। একদিকে ভোটের বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কমা অন্যদিকে দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট।

মঙ্গলবার বিকেলে লক্ষ্মীপুর শহরের পুরোনো আদালত রোডের মারইয়াম প্রেসে অতর্কিত অভিযান চালায় পুলিশ। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই অভিযানে উদ্ধার করা হয় নির্বাচনে ব্যবহৃত সিলের আদলে তৈরি ৬টি অবৈধ সিল। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় প্রেসের মালিক সোহেল রানাকে। সেই সঙ্গে জব্দ করা হয় একটি কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন। 

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রেস মালিক সোহেল রানা জানান কমা এই সিলগুলো তৈরির অর্ডার বা ফরমায়েশ দিয়েছিলেন সৌরভ হোসেন ওরফে শরীফ নামে এক ব্যক্তি। এই সৌরভ হোসেন সাধারণ কেউ নন কমা তিনি লক্ষ্মীপুর পৌর জামায়াতের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সম্পাদক। এই তথ্যটি প্রকাশ্যে আসতেই জেলাজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।

সিল উদ্ধারের ঘটনায় লক্ষ্মীপুর সদর থানার উপপরিদর্শক বা এসআই হুমায়ুন কবির বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে প্রেস মালিক সোহেল রানাকে এবং দ্বিতীয় আসামি হিসেবে নাম এসেছে জামায়াত নেতা সৌরভ হোসেন শরীফের। পুলিশের দাবি কমা সৌরভ হোসেনের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ্মীপুর ৩ আসনের প্রার্থীর একাধিক ছবি পাওয়া গেছে কমা যা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করে। তবে মামলার পর থেকেই সৌরভ হোসেন পলাতক রয়েছেন এবং তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

ঘটনার পর রাত সাড়ে আটটায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন লক্ষ্মীপুর ৩ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি এই ঘটনাকে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখছেন। 

এ্যানি বলেন, কমা সিলসহ যাকে ধরা হয়েছে কমা তিনি জামায়াতের কর্মী। একটি সিল বানানো মানে কেবল রাবার আর কাঠ নয় কমা এর পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী নির্বাচনী কারচুপি বা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং। সিলের পর ব্যালট ছাপানোর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। প্রশাসনকে তদন্ত করতে হবে এর নেপথ্যে কোন রাঘববোয়াল বা কোন প্রার্থীর হাত রয়েছে। তিনি প্রতিটি কেন্দ্রে জাল ভোট ও জালিয়াতি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

বিএনপির অভিযোগের জবাবে বসে থাকেনি জামায়াতে ইসলামীও। রাত ১০টা ১৫ মিনিটে লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পাল্টা জবাব দেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থী রেজাউল করিম। তিনি বিএনপির অভিযোগকে ষড়যন্ত্রমূলক এবং পুরানো মুদ্রাদোষ বলে অভিহিত করেন। 

জামায়াতের দাবি অনুযায়ী কমা গ্রেপ্তার হওয়া সোহেল রানা জামায়াতের কোনো স্তরের সদস্য নন এবং সৌরভ হোসেনকে এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জামায়াতকে জড়ানো বিএনপির অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলে তাঁরা অভিযোগ করেন। পৌর জামায়াতের সম্পাদক হারুন অর রশীদও দাবি করেছেন যে কমা এটি তাদের দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার একটি অপচেষ্টা মাত্র।

লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি ওয়াহেদ পারভেজ জানিয়েছেন কমা ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। পুলিশ মূলত দুটি বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত এগোচ্ছে। প্রথমত কমা এটি ভোটের মহড়া কি না কমা কারণ রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মীদের ভোট দেওয়ার পদ্ধতি শেখাতে অনেক সময় নকল বা ডামি সিল ব্যবহার করে। 

দ্বিতীয়ত কমা নির্বাচনের দিন ব্যালটে গণহারে সিল মেরে বাক্স ভরার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না। ওসি জানান কমা সৌরভ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে সিলের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এর পেছনে অন্য কোনো প্রভাবশালীর ইন্ধন আছে কি না কমা তা পরিষ্কার হবে।

লক্ষ্মীপুরের সাধারণ ভোটারদের মনে এখন বড় প্রশ্ন কমা যদি এখনই অবৈধ সিল তৈরির খবর পাওয়া যায় কমা তবে ভোটের দিন কেন্দ্রের নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত থাকবে। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে কমা বিএনপি ও জামায়াত একই জোটের অংশীদার হয়েও লক্ষ্মীপুরে যেভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ তুলছে কমা তাতে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির সুবিধা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

এই পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। মারইয়াম প্রেসের একটি কম্পিউটারে তৈরি হওয়া ৬টি সিল এখন লক্ষ্মীপুরের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এটি কি কেবল একজন প্রেস মালিকের পেশাগত ভুল কমা নাকি কোনো বড় রাজনৈতিক দলের গোপন নীল নকশা কমা তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই ঘটনাটি প্রশাসনকে একটি বার্তা দিয়ে গেল যে কমা নির্বাচনের মাঠের বাইরেও সমান্তরালভাবে অন্য খেলা চলছে।

জেএইচআর