ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল ১৩ বছরের শিশু আমেনা। চারপাশে উৎসবের আমেজ, বড়দের ভোট দেওয়া দেখছিল সে। কিন্তু মুহূর্তেই সেই আনন্দ বিষাদে রূপ নিল বিকট এক শব্দে। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রেশমা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কেন্দ্রে দুর্বৃত্তদের ছোড়া ককটেল বিস্ফোরণে রক্তাক্ত হলো সেই শিশুসহ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই আনসার সদস্য। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে যখন ভোটগ্রহণ পুরোদমে চলছিল, তখনই এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভোটকেন্দ্রের পাশেই একটি খাল রয়েছে। সকাল ৯টার দিকে একদল অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্ত খালের ওপার থেকে ভোটকেন্দ্র লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করে। বিকট শব্দে ককটেলটি বিস্ফোরিত হলে ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়।
এ সময় স্প্লিন্টারের আঘাতে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই আনসার সদস্য, সুকন্ঠ মজুমদার ও জামাল হোসেন। একই সময়ে নিজের স্বজনের সঙ্গে কেন্দ্রে আসা শিশু আমেনা খানম (১৩) গুরুতর আহত হয়। বিস্ফোরণের পরপরই ভোটারদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে।
আহত তিনজনকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে আনসার সদস্য সুকন্ঠ ও জামালের শরীরে স্প্লিন্টারের গভীর ক্ষত রয়েছে, তবে তারা বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত। শিশু আমেনা খানমের পায়ে ও হাতে আঘাত লেগেছে এবং তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। বিস্ফোরণের ঘটনার পর রেশমা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কেন্দ্রে সাময়িকভাবে ভোটগ্রহণ ব্যাহত হয়। ভোটারদের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক ও নারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক লক্ষ্য করা গেছে। অনেক ভোটার কেন্দ্র ছেড়ে বাড়িতে ফিরে যান। তবে ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এটি একটি পরিকল্পিত নাশকতার চেষ্টা ছিল যাতে ভোটাররা কেন্দ্রে আসতে ভয় পায়। তবে সেনাবাহিনী ও বিজিবির টহল বাড়ানোর পর পুনরায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। নির্বাচন উপলক্ষ্যে সারাদেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও খালের ওপার থেকে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকফোকরকেই সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ যে খালের ওপাশের এলাকাটি নির্জন হওয়ায় দুর্বৃত্তরা সেটিকে নিরাপদ পথ হিসেবে ব্যবহার করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী রেশমা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কেন্দ্রে সকাল ৯ ঘটিকার এই হামলায় ৩ জন আহত হন এবং হামলার ধরণ ছিল দূর থেকে ককটেল নিক্ষেপ। ঘটনার পর পর সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ সুপার সাংবাদিকদের বলেন যে যারা এই ন্যাক্কারজনক হামলার সঙ্গে জড়িত, তাদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। খালের ওপাশের এলাকাগুলোতে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।
গণতন্ত্রের উৎসবে ককটেলের গর্জন কোনোভাবেই কাম্য নয়। গোপালগঞ্জের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে শান্তি বিঘ্নিত করার একটি মহল এখনো সক্রিয়। তবে শিশু আমেনার আর্তনাদ আর আনসার সদস্যদের রক্ত যেন বৃথা না যায় সেজন্য প্রশাসনকে আরও সজাগ হতে হবে। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে, আর এই সময়ের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
জেএইচআর