সময়ের অমোঘ নিয়মে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে হারিয়ে গেছে দীর্ঘ তিনটি দশক। কৈশোরের সেই চঞ্চল দিনগুলো আজ কেবলই স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি। কিন্তু না, সেই স্মৃতিরা যে আজও কতটা জীবন্ত, কতটা প্রাণোচ্ছল— তার এক অনন্য নজির সৃষ্টি হলো পবিত্র ঈদুল ফিতরের বিকেলে। চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কুড়ুলগাছি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ এদিন পরিণত হয়েছিল এক টুকরো নস্টালজিয়ায়। উপলক্ষ ছিল এসএসসি ৯৪ ব্যাচের এক বর্ণাঢ্য এবং আবেগঘন ঈদ পুনর্মিলনী।
স্মৃতির টানে শিকড়ের আঙিনায়
ঈদের আনন্দ আর বন্ধুদের সাথে কাটানো সময় এই দুইয়ের মিশেলে তৈরি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব আমেজ। বিকেল ৫টা বাজার আগে থেকেই একে একে দীর্ঘদিনের পুরনো বন্ধুরা জড়ো হতে থাকেন সেই চেনা স্কুল মাঠে, যেখানে পা রেখেই তারা জীবনের প্রথম বড় অর্জনের স্বাদ পেয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ৩২ বছর পর একে অপরের মুখোমুখি হওয়া, বুকে জড়িয়ে ধরা আর ফেলে আসা দিনগুলোর গল্পে মেতে ওঠা যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতির জন্ম দিয়েছিল।
বন্ধুত্বের জয়গানে মুখরিত প্রাঙ্গণ
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এসএসসি ৯৪ ব্যাচের প্রাণভোমরা হাশেম রেজা, মোয়াজ্জেম, রাজু, হাসান, মামুন, সহিদুল, মনিরুল, সাঈদ, কাদের, মিরাজ, আসকার, ডালিম, ছানোয়ার সহ আরও অনেক বন্ধু। প্রবাসে থাকা বা কর্মব্যস্ততার কারণে দূরে থাকা অনেক বন্ধুই এদিন সব বাধা পেরিয়ে ছুটে এসেছিলেন প্রিয় সহপাঠীদের কাছে।
বিকেল গড়াতেই স্কুল প্রাঙ্গণে দেখা যায় আনন্দের এক বাঁধভাঙা জোয়ার। কেউ কাউকে জড়িয়ে ধরে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন, কেউবা আবার স্কুল জীবনের সেই পুরোনো ডাকনাম ধরে ডেকে একে অপরকে চমকে দিচ্ছেন। দীর্ঘ সময় পর দেখা হওয়ায় অনেকের চোখেমুখে ছিল বিস্ময় আর আনন্দের ঝিলিক। হাশেম রেজা যখন বন্ধুদের নাম ধরে ডাক দিচ্ছিলেন, তখন পুরো স্কুল চত্বর যেন নব্বইয়ের দশকের সেই চঞ্চল ক্লাসরুমে ফিরে গিয়েছিল।
আড্ডা আর স্মৃতিচারণ: হারানো দিনের গল্প
বিকেল ৫টা থেকে শুরু হওয়া এই মিলনমেলায় প্রধান আকর্ষণ ছিল একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় ও স্মৃতিচারণ। স্কুল মাঠের যে কোণে বসে টিফিন ভাগ করে খাওয়া হতো, যে আমতলায় বসে আড্ডা চলতো সেই জায়গাগুলোতে দাঁড়িয়ে বন্ধুরা মেতে ওঠেন পুরোনো দিনের নানা হাস্যকর ও আবেগঘন গল্পে।
বন্ধুরা আবেগাপ্লুত হয়ে বলছিলেন, আজ আমরা বাস্তব জীবনের নানা প্রয়োজনে কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ সফল ব্যবসায়ী, কেউ সাংবাদিক কিংবা কেউ দায়িত্বশীল গৃহকর্তা। কিন্তু এই স্কুলের গেট দিয়ে যখন ভেতরে ঢুকলাম, তখন মনে হলো আমরা সেই ১৫-১৬ বছরের কিশোর। আমাদের মাঝ থেকে যেন তিন দশক মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। এই মাঠ, এই ক্লাসরুম আমাদের সেই পুরনো সত্তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।
ঈদ আনন্দ ও বন্ধুত্বের মেলবন্ধন
ঈদের খুশির সাথে বন্ধুদের এই মিলন এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছিল। উপস্থিত বন্ধুদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ব্যস্ত নাগরিক জীবনে আমরা সবাই যখন যান্ত্রিক হয়ে পড়ছি, তখন এই ধরণের আয়োজন মনের খোরাক জোগায়। নিজেদের শিকড়কে চেনার এবং বন্ধুদের সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করার এটিই শ্রেষ্ঠ উপায়।
বিশেষ করে ডালিম, ছানোয়ার এবং মিরাজদের চুটকি ও রসিকতায় আড্ডার পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও আনন্দঘন। অন্যদিকে আসকার ও সাঈদদের স্মৃতিচারণে মাঝেমধ্যে আড্ডায় নেমে আসত কিছুটা বিষণ্ণতা সেই বন্ধুদের কথা ভেবে যারা আজ আর এই পৃথিবীর মায়ায় নেই। তাদের অভাব আজ প্রতিটি বন্ধু অনুভব করছেন।
ক্যামেরা বন্দি শৈশব আর ছামাদের চপলতা
পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে আনন্দের আরেকটি বড় অনুষঙ্গ ছিল ছবি তোলা। বন্ধু ছামাদ পুরোটা সময় উপস্থিত থেকে বন্ধুদের বিভিন্ন আঙ্গিকে ছবি তোলায় মেতে ছিলেন। কখনো দলবেঁধে মাঠের মাঝখানে, কখনোবা ক্লাসরুমের বারান্দায় ছামাদের ক্যামেরার ক্লিকেই বন্দি হচ্ছিল হারিয়ে যাওয়া শৈশবের সেই অমলিন হাসিগুলো। বন্ধুদের হাসিমুখ আর শৈশবের পাঠশালায় ফিরে আসার সেই আনন্দ যেন ডিজিটাল লেন্সের মাধ্যমে ভবিষ্যতে চিরস্থায়ী হয়ে রইল।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সংহতি
কেবল আড্ডা আর গল্পেই সীমাবদ্ধ ছিল না এই পুনর্মিলনী। উপস্থিত বন্ধুরা একমত হন যে, এখন থেকে নিয়মিত বিরতিতে তারা এমন মিলনমেলার আয়োজন করবেন। পাশাপাশি এসএসসি ৯৪ ব্যাচের পক্ষ থেকে বিদ্যালয়ের উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখা যায় কিনা এবং বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া বা অসহায় বন্ধুদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য একটি শক্তিশালী কল্যাণ তহবিল গঠনের বিষয়েও প্রাথমিক আলোচনা হয়। তারা চান এই বন্ধুত্ব যেন কেবল উৎসবেই সীমাবদ্ধ না থেকে একে অপরের বিপদে-আপদেও ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
সমাপ্তির সুর
সূর্য যখন পশ্চিম দিগন্তে পাটে বসেছে এবং সন্ধ্যার আবছায়া নেমে এসেছে, তখনো বন্ধুদের আড্ডা থামার লক্ষণ ছিল না। তবে নিয়মের টানে বিদায় নিতেই হয়। এক বুক স্মৃতি আর অটুট বন্ধুত্বের প্রতিশ্রুতি নিয়ে একে একে বিদায় নেন বন্ধুরা। যাওয়ার সময় সবার চোখে ছিল তৃপ্তির আভা আর মুখে ছিল সেই চিরচেনা হাসি।
কুড়ুলগাছি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই পুনর্মিলনী প্রমাণ করে দিল যে, সময় হয়তো মানুষের বয়স বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু প্রকৃত বন্ধুত্বের কাছে বয়স কেবলই একটি সংখ্যা মাত্র। এসএসসি ৯৪ ব্যাচের এই মহামিলন যেন কুড়ুলগাছির বাতাসে এক নতুন বন্ধুত্বের সুবাস ছড়িয়ে দিয়ে গেল। এই দিনটি বন্ধুদের হৃদয়ে এক অক্ষয় স্মৃতি হিসেবে থেকে যাবে আজীবন।
এএন